বাংলাদেশে আধুনিক শিল্পকলা চর্চার সূচনা ও
প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের সঙ্গে যে
কয়েকজন প্রখ্যাত শিল্পী জড়িত ছিলেন,
কামরুল হাসান তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি শুধু
শিল্পচর্চা বা শিল্পকলার শিক্ষকতায়ই
জড়িত ছিলেন না, এদেশের প্রতিটি
সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও কর্মযজ্ঞেও তিনি ঘনিষ্টভাবে
সংশ্লিষ্ট ছিলেন। লোকশিল্পের
বিকাশেও তিনি অসামান্য অবদান রেখে
গেছেন। পশ্চাৎপদতা ও কূপমন্ডুতার বিরুদ্ধে
অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনা গঠনে
তিনি আমৃত্যু নিরলসভাবে কাজ করে
গেছেন। সত্য উচ্চারণে তিনি সবসময়ই ছিলেন সাহসী।
তাঁর জীবন ছিল যেমন বৈচিত্রময়
তেমনি বহু বর্ণিল ঘটনারাগে রঞ্জিত।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
কামরুল হাসান বাংলাদেশের চারুশিল্প ও সাংস্কৃতিক
জগতের এক উজ্জ্বল ও অবিসংবাদিত
ব্যক্তিত্বের নাম। ১৯২১
খ্রিস্টাব্দের ২
ডিসেম্বর কলকাতার সে সময়কার শহরতলিতে অবস্থিত
তিলজালা গোরস্থানের মধ্যেকার
একটি ঘরে কামরুল হাসানের জন্ম।
তাঁর
পিতৃনিবাস ছিল বর্ধমান জেলার (বর্তমানে ভারতের
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যাধীন) কালনা
থানার নারেঙ্গা গ্রামে। কামরুল হাসানের
পুরো
নাম এ.এস.এম. কামরুল হাসান অর্থাৎ আবু শরাফ (শার্ফ)
মোহাম্মদ কামরুল হাসান। তাঁর
ডাকনাম ছিল সাতন। কামরুল
হাসানের জন্মের আগে তাঁর মায়ের পরপর কয়েকটি
সন্তানের মৃত্যু হলে এতদ্দেশীয়
সংস্কারবশত তাঁকে সাতকড়ির বিনিময়ে
কেনা
হয় বলে তাঁর নাম হয় সাতকড়ি; সংক্ষেপে সাতন। তাঁর
পিতার নাম মোহাম্মদ হাশিম ও
মাতার নাম মোসাম্মৎ আলিয়া
খাতুন।
প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর (১৯৩৬) পর তাঁর পিতা দ্বিতীয়বার
বিয়ে করেন। কামরুল হাসানের
এ মায়ের নাম মালিহা খাতুন। কামরুল
হাসান তাঁর পিতৃ ও মাতৃ উভয় পরিবার-উৎস থেকে
উত্তরাধিকারেসূত্রে আভিজাত্য-গৌরব,
উন্নত ও মার্জিত অভিরুচি এবং
ন্যায়নিষ্ঠ ও সৎ জীবনাদর্শ লাভ করেন।
বাল্য-কৈশোর
জন্ম থেকে কলকাতায় বসবাস করলেও গ্রামজীবনের সঙ্গে
সেই বাল্যবয়সেই কামরুল
হাসানের যোগাযোগ ছিল নিবিড়।
কামরুল হাসানের পিতা ও মাতা উভয়েরই আদিনিবাস ছিল
বর্ধমান জেলার (পশ্চিমবঙ্গ)
নারেঙ্গা গ্রামে। তাঁর পিতা প্রতিবছর
গ্রীষ্মের ছুটিতে সন্তানদের গ্রামে পাঠাতেন। কামরুল
হাসান ও তাঁর অন্য ভাইবোনদের
জন্য এই গ্রামভ্রমণ ছিল অতিশয়
আনন্দের। বাগনাপাড়া রেলস্টেশনে নেমে গরুর গাড়িতে
চড়ে চারমাইল পথ পাড়ি দিয়ে
নারেঙ্গায় পৌঁছাতে হতো। কামরুল
হাসান ও তাঁর অগ্রজ গরুর গাড়িতে না চড়ে গাড়ির পেছন
পেছন হেঁটে গান গাইতে
গাইতে আনন্দ ফূর্তি করে পথ অতিক্রম
করতেন। তাঁদের গ্রামের বাড়ির আশেপাশেই ছিল
সাঁওতালপাড়া, জেলেপাড়া ও
বাগদিপাড়া। এসব পাড়ায় ঘুরে বেড়ানো,
তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা লাভ প্রভৃতিতে কামরুল
হাসানের আগ্রহ ছিল প্রবল।
গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে নিকটবর্তী
বটতলায় জমজমাট আড্ডাদান, পুকুরে সাঁতার কাটা, নিজ
হাতে বাঁশি তৈরি করে বাজানো
প্রভৃতির মধ্য দিয়ে তিনি এই
ভ্রমণকে আনন্দে পরিপূর্ণ ও উপভোগ্য করে তুলতেন।
বাল্যবয়সের একটি ঘটনার কথা কামরুল হাসানের নিজের
স্মৃতিচারণসূত্রে জানা যায়।
১৯২৮ সালে প্রথম তাঁর পিতার
অফিসে
টেলিফোন এলে সেই টেলিফোনে পরিবারের সকলে কথা
বলেছিলেন। কামরুল হাসানের
ভাষায়, "আমি প্রথম টেলিফোনে
কথা বলি ১৯২৮ সালে। কলকাতায় আমাদের আব্বার
অফিসের টেলিফোনে। প্রথম যেদিন
টেলিফোন বসে সেদিনটির কথা
আমার স্পষ্ট মনে পড়ে। আমরা সকলেই আমাদের বড় মামার
সাথে কথা বললাম। আমাদের
মাও বলেছিলেন। তাঁর চোখে
মুখে সে কি বিস্ময়! অতিশয় রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে,
বিজ্ঞানের এই পরিচয়ে
স্বভাবতই অবাক হয়ে
গিয়েছিলেন।
শিক্ষাজীবন
১৯৩০ সালে কলকাতার তালতলাস্থ ইউরোপীয়ন এসাইলাম
লেনে অবস্থিত মডেল এম.ই
স্কুলের ইনফ্যান্ট ক্লাস থেকেই
কামরুল হাসানের বিদ্যাশিক্ষার শুরু। এই মডেল স্কুলগুলির
পরিকল্পনা করেছিলেন
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-৯১)। তাঁর
স্কিমের এটাই ছিল শেষ স্কুল যা তখনো টিকে ছিল।
রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর বাল্যবয়সে
কয়েকদিনের জন্য একটি স্কুলেই কেবল
গিয়েছিলেন, সেটি এই মডেল এম.ই স্কুল। এই স্কুলেরই
ছাত্র ছিলেন কবি ফররুখ আহমদ
(১৯১৮-৭৪), আবুল হাশেম
(খুলনা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ),
এ.টি.এম. মুস্তফা (পরে মন্ত্রী),
আবুল খায়ের (বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন
সচিব), নুরুজ্জামান (শিল্প মন্ত্রণালয়ের সাবেক যুগ্ম
সচিব), কবি হাবীবুর রহমান
(১৯২২-৭৬), ড. নাজিমুদ্দিন আহমদ
(প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সাবেক ডাইরেক্টর), মোশাররফ
হোসেন (পরে রাজনীতিবিদ),
শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার (১৯২৭-৭১)
প্রমুখ। কবি ফররুখ আহমদের অনুজ মুনির আহমদ কামরুল
হাসানের সহপাঠী ছিলেন। এই
মডেল এম.ই স্কুলে কামরুল
হাসান ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পাঠ গ্রহণ করেন।
এই স্কুলে পড়াশুনার পাশাপাশি ছবি আঁকা ও মডেলিং
ক্লাস-এর সুব্যবস্থা ছিল। ড্রইং
মাস্টার ছিলেন শ্রী সতীশবাবু। তিনিই
ছিলেন কামরুল হাসানের চিত্রকলা বিষয়ক প্রথম শিক্ষক।
প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শনসহ
একটি বিরাট সাতমহল বিশিষ্ট জমিদার
বাড়িতে ছিল স্কুলটির অবস্থান। বাড়িটির বিশালত্বের
কারণে ওই একই বাড়িতে মডেল
স্কুলের সাথেই ছিল নর্মাল ট্রেনিং স্কুল।
গ্রামের স্কুলের শিক্ষকরা বিশেষ ট্রেনিং কোর্স করতে
সেখানে যেতেন। নর্মাল স্কুলেরও
একজন ড্রইং শিক্ষক ছিলেন। নাম :
দ্বারিকবাবু। সতীশবাবুর অনুপস্থিতিতে দ্বারিকাবাবু
মডেল স্কুলে ড্রইংয়ের ক্লাস
নিতেন। নর্মাল ট্রেনিং স্কুলের ড্রইং এবং
মডেলিং অবশ্য শিক্ষণীয় ছিল। নর্মাল স্কুলের শিক্ষার্থী
শিক্ষকেরা মাটি দিয়ে
মডেলিং করতেন। তাঁদের জন্য কৃষ্ণনগর থেকে
গাড়িতে করে মাটি নিয়ে আসা হতো। মডেল স্কুলের
ছাত্ররা তখনই প্লাস্টিসিন ব্যবহার
করতে শিখেছিল। এখনকার মতো
ফ্যাক্টরিতে তৈরি প্লস্টিসিন পাওয়া যেত না।
সতীশবাবুই এর ফর্মূলা শিখিয়ে
দিয়েছিলেন। উপাদানের মধ্যে ছিল খড়িমাটি,
মৌচাকের মোম, নারকেল তেল, ভেসলিন ও রং। কোনটার
পরিমাণ কতটুকু হবে সতীশবাবু
তা বুঝিয়ে দিয়ে বাড়ি থেকে
তৈরি করে আনতে বলতেন। কামরুল হাসান সতীশবাবুর অতি
প্রিয়ভাজন ছিলেন।
তবে মডেল স্কুলে চিত্রাঙ্কন শিক্ষার পূর্বেই প্রায় শিশু
বয়স থেকে কামরুল হাসানের
মধ্যে এ-সংক্রান্ত আগ্রহ দেখা যায়। তাঁর
নিজেরই ভাষায় : "আমার ছবি আঁকার নেশা ধরিয়াছিল
সেই শিশুকালে। অক্ষর পরিচয়ের
পূর্বেই আমি রেখার পরিচয়
পাইয়াছিলাম, সে রেখা মানুষকে জ্বালায়, পোড়ায়,
হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে, আবার
আনন্দলোকের অনুভতির দরজাও
খুলিয়া দেয়।
তাঁর অন্তর্জগতে শৈল্পিক অনুভূতির এই জাগরণের পেছনে
তাঁর পিতারও একটি ভূমিকা আছে।
সেই ভূমিকাটি হয়ত
একান্তই
প্রাথমিক, কিন্তু গুরুত্বে খাটো নয়। অনেককেই তিনি
ব্যক্তিগত পর্যায়ে এ তথ্য
জানিয়েছেন যে, শিশুকালে তাঁর পিতা একবার
শ্লেটে হাত চেপে ধরে আঙ্গুল বরাবর পেন্সিল চালিয়ে
তাঁর ছোট হাতখানি এঁকে এমন এক
রেখার খেলা দেখালেন যার আনন্দ
থেকে তিনি নিজেকে আর নিবৃত্ত রাখতে পারেননি।
আত্মহারা হয়ে ওই খেলায় মেতে
থাকতেন। শেষে এমন অবস্থা দাঁড়ায় যে
হাত না চেপেই তিনি অনায়াসে হাতের ছবি আঁকতে
পারতেন।
কামরুল হাসান মডেল এম.ই. স্কুল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী পাস
করে, পিতার আগ্রহে, কলকাতা
মাদ্রাসার অ্যাংলো-পার্সিয়ান
বিভাগে
সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন। আনুমানিক ১৯৩৬/৩৭ সালের
ঘটনা এটি। মাদ্রাসা শিক্ষার
সাথে সাথে আধুনিক শিক্ষার জন্য
কলকাতা মাদ্রাসায় অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগ চালু করা
হয়েছিল। মাদ্রাসায় ভর্তি
সম্পর্কে কামরুল হাসান লিখেছেন, "মডেল
স্কুল থেকেই ষষ্ঠ শ্রেণীর ধাপ অতিক্রম করার পরই আমার
আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছে
ছিল। কিন্তু অভিভাবক এবং আত্মীয়-
স্বজনদের প্রশ্নের কোন সদুত্তর না দিতে পারায় আমাকে
পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল এবং
কলকাতা মাদ্রাসার এ্যাংলো
পার্সিয়ান বিভাগে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হতে বাধ্য
হলাম। এই মাদ্রাসায় আবার
বাংলা এবং উর্দু বিভাগ ছিল। আমি বাংলা
বিভাগে ঢুকলাম।" তবে সপ্তম শ্রেণী থেকে অষ্টম
শ্রেণীতে ওঠার 'সৌভাগ্য' তাঁর
হয়নি। মূল কারণ, পড়াশুনায় অমনোযোগ।
মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েও তাঁর ছবি আঁকার উৎসাহে ভাটা
পড়েনি। তাঁর তিনরঙা একটি ছবি
মাদ্রাসার বার্ষিক ম্যাগাজিনেই ছাপা
হয়েছিল।
গভর্নমেন্ট স্কুল অফ আর্টস
কামরুল হাসানের পিতা ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি হিসেবে
পুত্রের শিল্পকলা চর্চার বিরোধী
ছিলেন। কিন্তু কামরুল হাসানের প্রবল
আগ্রহের কারণে তিনি তাঁর শিল্পশিক্ষায় শেষ পযর্ন্ত
সম্মতি দেন এই শর্তে যে তাঁর
পড়াশুনার যাবতীয় খরচ কামরুল
হাসানকেই সংগ্রহ করতে হবে। আর এভাবেই ১৯৩৮ সালের
জুলাই মাসে কামরুল হাসান
কলকাতার 'গভর্নমেন্ট স্কুল অফ
আর্টস'-এ ভর্তি হন। ভর্তিতে খরচ হয়েছিল চার টাকা।
ম্যাট্রিক পাসের আগেই আর্ট স্কুলে কেন তিনি ভর্তির
জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছিলেন তারও
একটি যুক্তি তিনি এক লেখায় তুলে
ধরেছেন। তিনি বলেছেন : "মাত্র সপ্তম শ্রেণীর পড়া
সাঙ্গ করে কলকাতা আর্ট স্কুলে
ভর্তি হই। এছাড়া উপায় ছিল না, কারণ
ম্যাট্রিক পাশ করে আর্ট স্কুলে ভর্তি করে দেওয়ার শর্ত
আমার অগ্রজকে দেওয়ার পর যখন
দেখলাম যে অভিভাবকরা তাঁদের
শর্তে শ্রদ্ধাবান নন, তখন আমি নিজের পথ বেছে নিলাম
সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্বে।"
কামরুল হাসানের ভাষায় আর্ট স্কুলে তাঁর ভর্তির
বিবরণটি এইরূপ, "আমি তখন কলকাতা
মাদ্রাসার ছাত্র। সপ্তম শ্রেণীতে
পড়ছি। পড়ালেখার চাইতে ছবিতে মেতে থাকতে পারলে
যেন বর্তে যাই। সে মাতামাতি
এমন পযার্য়ে পৌঁছলো যে অষ্টম
শ্রেণীর
পরিবর্তে সোজা চৌরঙ্গীর আর্ট স্কুলে ভর্তির জন্য টেস্ট
পরীক্ষা দিয়ে, পাস করে,
ভর্তির ফরম নিয়ে সোজা আব্বার কাছে
এসে
বিনীতভাবে দাঁড়ালাম। ভূরু কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন
আব্বা। বললাম আগামীকাল
আপনাকে আর্ট স্কুলে গিয়ে প্রিন্সিপাল
সাহেবের সাথে দেখা করতে হবে এবং কোন বিশিষ্ট
ব্যক্তির কাছ থেকে একটি পরিচয়
পত্রও নিয়ে যেতে হবে। আমার
ভাবসাবে আব্বা হয়তো বুঝেছিলেন কোনরকম কড়া টান
দিলেই ঘুড়ি কেটে যাবে। তাই
ঢিলে দিলেন। পরিচয়পত্রের জন্যে
নিয়ে গেলেন খান বাহাদুর ওয়ালিউল ইসলাম সাহেবের
কাছে। তিনি খুব স্নেহভরে আমার
ড্রইং খাতার ওপর চোখ বুলিয়ে
তাঁর
নিজস্ব প্যাডে কয়েক লাইন লিখে দিলেন। ওয়ালিউল
ইসলাম সাহবের উৎসাহদানে, কেবল
আমিই নই আমার আব্বাও
উৎসাহিত হলেন।
আবদুল মঈন ছিলেন কলকাতা 'গভর্নমেন্ট স্কুল অফ
আর্টস'-এ প্রথম মুসলমান শিক্ষক। মাত্র
ঊনত্রিশ বছর বয়সে টাইফয়েড
রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৩৯ সালের ১৬ মার্চ তারিখে তাঁর
জীবনাবসান ঘটে। আর্ট স্কুলে
ভর্তি হয়ে কামরুল হাসান সরাসরি
শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন শিল্পী আবদুল মঈনকে।ফলে
তাঁর মৃত্যু কামরুল হাসানের মধ্যে
তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ওই
শিক্ষককে তিনি কোনোদিন ভুলতে পারেননি। তাঁর মৃত্যুকে
স্মরণ করে ১৯৮২ সালেও
লিখছেন, "আমার জীবনে ১৬ই মার্চ
একটি বিশেষ দিন। এই দিনটি আমি কোন বছরেই ভুলিনা,
কাউকে বলিও না কিন্তু
নিয়মিতভাবে আমার প্রথম শিক্ষক মঈন
স্যারের মৃত্যুদিবস আমি এই দীর্ঘদিন নীরবে 'স্মরণ করে
চলেছি।" শিল্পী ও শিক্ষক
আবদুল মঈনের মৃত্যুর পর কামরুল
হাসান শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন শিল্পচার্য জয়নুল
আবেদিনকে। তাঁর ভাষায়, "মঈন
স্যার মারা যাওয়ার পর ১৯৩৯
সালের এপ্রিল মাসেই তাঁর স্থলাভিষিক্ত হলেন মাস্টার
সাহেব জয়নুল আবেদিন। ঐ
বছরের জুন মাস পযর্ন্ত সরাসরি তাঁর
ছাত্র
হিসেবে ছিলাম।"
আর্ট স্কুলে পড়ার যাবতীয় খরচ কামরুল হাসানকেই সংগ্রহ
করতে হয়েছে। এজন্য তাঁকে
কঠোর পরিশ্রমও করতে হয়েছে।
কামরুল হাসানের পিতা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পুত্রের
শিল্পশিক্ষার ব্যয়বহনে অস্বীকৃতি
প্রকাশ করেছিলেন। তবে পুত্রের প্রতি
তাঁর সহানুভূতি ছিল। তাছাড়া শিল্প সম্পর্কে কামরুল
হাসানের পরিবারের এই
দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরবর্তীকালে কিছুটা পরিবর্তন
আসে। বিশেষত মন্বন্তরের সময় (১৩৫০/১৯৪৩) গেজেট
পত্রিকায় প্রকাশিত জয়নুল
আবেদিনের স্কেচ দেখে তিনি শিল্পের
প্রতি আকৃষ্ট হন। এসব কারণে কামরুল হাসানকে কবরের
নকশা আঁকার কাজ দিয়ে তাঁর কিছু
আয়ের ব্যবস্থা তিনি নিজেই
করে দিয়েছিলেন। তবে এতে নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা
ছিল না। নিয়মিত উপার্জনের জন্য
কামরুল হাসান এক পুতুল
তৈরির
কারখানায় চাকরি নিয়েছিলেন। সেখানে সেলুলয়েডের
পুতুলের চোখ আঁকতে হতো তাঁকে।
প্রখর আলোয় ওই চোখ আঁকতে
গিয়ে কামরুল হাসানের নিজেরই দৃষ্টিশক্তি খানিকটা
ক্ষীণ হয়ে পড়েছিল। এই
অভিজ্ঞতার আলোকে পরবর্তীকালে তিনি
চক্ষুদান নামে একটি গল্পও লিখেছিলেন। এসব কাজের
জন্য তাঁর ঘরে ফিরতে অনেক রাত
হতো। তবে রাত যতই হোক
তাঁর
পিতা জেগে থাকতেন এবং নিজেই দরজা খুলে দিতেন।
শিল্পশিক্ষার জন্য উপার্জন করতে
বাধ্য হওয়ায় পিতার প্রতি
কামরুল
হাসানের মনে অভিমান ছিল।
অর্থ উপার্জনসহ নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের
সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ফলে আর্ট স্কুলে
ছ'বছরের কোর্স শেষ করতে
কামরুল হাসানের ন'বছর লেগেছিল। আর্থিক সমস্যা ও
পারিবারিক চাপে তাঁকে ভর্তি
হতে হয়েছিল ড্রাফসম্যানশিপ বিভাগে।
কারণ ওই বিভাগ থেকে পাস করে বেরুলে চাকরি পাওয়া
সহজ ছিল। কামরুল হাসান
বলেছেন, "এ ছিল এমন একটা
বিভাগ যে বিভাগে ফাইন আর্টসের ছেলেরা গিয়ে
স্ট্যাণ্ড করে। আর আমি সেখানে গিয়ে
করলাম ফেল।" ড্রাফটর্সম্যানশিপ
বিভাগ থেকে পরে অবশ্য তাঁকে ভর্তি করে নেয়া হয়েছিল
চারুকলা বিভাগে এবং সেখান
থেকেই ১৯৪৭ সালে তিনি ডিপ্লোমা
অর্জন করেন।
পারিবারিক জীবন
কামরুল হাসান ১৯৫৯ সালে মরিয়ম বেগমের সঙ্গে
পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। মরিয়ম বেগম
বিশিষ্ট নজরুল সংগীত শিল্পী
ফিরোজা বেগমের বোন। বিয়ের অনেক আগে থেকেই দুজনের
মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
অধ্যাপক আবদুল হাফিজ লিখেছেন,
"দুজনের প্রণয়সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ১৯৫৩ সাল থেকেই।
সে সময়কার বিজি প্রেসের
ডাইরেক্টর জেনারেল বদরুল হুদা
খন্দাকর ছিলেন অত্যন্ত সংস্কৃতিবান ব্যক্তিত্ব। মরিয়ম
বেগম (সেসময়ে খন্দকার) ছিলেন
তাঁর স্ত্রী। তাঁর গেণ্ডারিয়ার বাড়িতে
প্রায়ই গান-বাজনার আসর বসত। সেই আসরে যেমন
বিশিষ্ট গায়কদের সমাগম ঘটত তেমনি
বিশিষ্ট সংস্কৃতিবেসীদেরও
সেখানে ছিল অবাধ যাতায়াত। এই গানের আসরে অন্যদের
সঙ্গে কামরুল হাসানও যেতেন।
১৯৫৮ সালে মরিয়ম বেগমের
সঙ্গে বদরুল হুদা খন্দকারের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এর
ফলে তিনি বিশ হাজার টাকা লাভ
করেন। বিবাহবিচ্ছেদের পর মরিয়ম
বেগম কামরুল হাসানের সঙ্গে ওই বিশ হাজার টাকা
দিয়ে ১৯৫৮ সালেই ১ নম্বর ভিতর
বাড়ি লেন-এ একটি
অ্যাডভারটাইজিং ফার্ম গঠন করেন। ওই ফার্মের
অংশীদার ছিলেন তিনজন- মরিয়ম
বেগম, কামরুল হাসান ও সরদার
জয়েনউদ্দীন। অতঃপর মরিয়ম বেগমের সঙ্গে কামরুল
হাসানের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়
এবং ১৯৫৯ সালে দুজনে
বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
ড. আনিসুজ্জামানের ঠাটারিবাজারস্থ পিতৃনিবাসের
একতলায় আবদুল গনি হাজারী কিছুকাল
ভাড়াটে হিসেবে বাস করেছেন।
ওই ঘরেই কামরুল হাসানের বিয়ে হয়। বিয়েতে খুব
অল্পজনই উপস্থিত ছিলেন। আবদুল গনি
হাজারী ছিলেন কনেপক্ষের
উকিল এবং ড. আনিসুজ্জামান ও সৈয়দ আহমদ হোসেন
ছিলেন বিয়ের সাক্ষী। নবদম্পতি
তখন ১ নম্বর ভিতর বাড়ি লেন-
এর দোতলায় বসবাস শুরু করেন। পরে মরিয়ম বেগমের
মালিকানায় ১৫/২ সেন্ট্রাল রোডে
যে- বাড়ি ছিল তাতে উঠে যান।
কামরুল হাসানের একমাত্র সন্তান সুমনা হাসান
জানিয়েছেন, তাঁর বাবার একটা
দৈনন্দিন রুটিন ছিল। তিনি রুটিন মাফিক
কাজ করতে ভালোবাসতেন। অফিসে কখনও দেরি করে
যেতেন না এবং অফিস থেকেও
নিয়মিতভাবে বাসায় ফিরতেন।
একান্ত কোনো কাজ না থাকলে এই নিয়মে তিনি ব্যত্যয়
ঘটাতেন না।
ছাত্রাবস্থায় শিল্পকর্ম
১৯৪৫ সালের শেষার্ধে কলকাতা আর্টস্কুলে ভর্তির
উদ্দেশ্যে খালেদ চৌধুরী গিয়েছিলেন
জয়নুল আবেদিনের ১৪নং সার্কাস
রোডের বাসায়। সেখানেই কামরুল হাসানের সঙ্গে
পরিচয়। তাঁর ভাষায়, "কামরুল তখন
চারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ বর্ষের
অর্থাৎ শেষ বর্ষের ছাত্র... একসময় কামরুলের হাত
থেকে স্কেচ- বুকখানা চেয়ে নিয়ে
পাতা ওল্টাতেই আমার চক্ষুতো
কপালে। সর্বনাশ, কার সামনে আমি আমার অক্ষম
স্কেচগুলো আবেদিন সাহেবকে
দেখাচ্ছিলাম। যাই হোক মনের ভাব গোপন
রেখে স্কেচবইটা যতই উল্টে-পাল্টে দেখছিলাম, ততই
নিজের অযোগ্যতা বড় বেশি প্রকট
হয়ে উঠছিল। আমি কেমন গুটিয়ে
যাচ্ছিলাম নিজের মধ্যে...।"
কামরুল হাসান আর্ট স্কুলের ছাত্র থাকাবস্থায়, ১৯৪৬
সালের শেষ দিকে কলকাতার
ইসলামিয়া কলেজে মুসলিম আর্ট
এক্সিবিশন অনুষ্ঠিত হয়। শুধু মুসলমান শিল্পীদের চিত্র
প্রদর্শিত হয় এ প্রদর্শনীতে।
কামরুল হাসানও এতে অংশগ্রহণ করেন।
কলকাতা আর্ট স্কুলে পাঠ্যাবস্থায়ই কামরুল হাসান
অলংকরণ ও সৌন্দর্য বর্ধনসূত্রে
পত্র-পত্রিকার জগতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন।
এছাড়া সীমিত আকারে হলেও পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গেও
তিনি যুক্ত হয়েছিলেন। কামরুল
হাসানের স্বীকারোক্তি থেকেই
আমরা জানতে পারি, ১৯৪২ সালে কবি হাবীবুর রহমানের
(১৯২২-৭৬) সঙ্গে একত্রে
'আবীর' নামে একটি হাতে লেখা
পত্রিকা
বের করেছিলেন।
কামরুল হাসানের স্মৃতিচারণসূত্রে জানা যায়, ১৯৪৩-এ
(বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে) কাজী
আফসারউদ্দীন সম্পাদিত দ্বিমাসিক
পত্রিকা
মৃত্তিকা'র প্রচ্ছদ ছিল তাঁরই আঁকা। এছাড়া ছিল
সাপ্তাহিক মিল্লাত পত্রিকা। এই
পত্রিকায় কামরুল হাসান নিয়মিত কার্টুন
আঁকতেন 'ভীমরুল' ছদ্মনামে। সাপ্তাহিক মিল্লাত ছাড়া
কামরুল হাসান আলোড়ন পত্রিকায়ও
নিয়মিত কার্টুন আঁকতেন। এছাড়া
কমরেড নামক পত্রিকায়ও তাঁর কার্টুন বেরিয়েছে। যদিও
পরবর্তীকালের ঘটনা, তবু এ
প্রসঙ্গেই উল্লেখযোগ্য : রাষ্ট্রভাষা
আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে (মার্চ ১৯৪৮) 'ভীমরুল'
ছদ্মনামে কামরুল হাসান
নাজিমুদ্দিনকে নিয়ে কলকাতার আলোড়ন
পত্রিকায় যে কার্টুনটি এঁকেছিলেন সেটি পুর্ববঙ্গের
মুসলিম লীগ সরকারের তীব্র
সমালোচনার শিকার হয়েছিল। ফয়েজ
আহমদের ভাষায়, "পত্রিকাটির সে সংখ্যা পূর্ব বাংলায়
প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু
কয়েকটি কপি কোনক্রমে নোয়াখালিতে
পৌঁছাতে পারে। সেখান থেকেই প্রথমে কার্টুনটির
বিরুদ্ধে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।
কার্টুনের বিষয়বস্তু ছিল : স্টেজে
দাঁড়িয়ে নাজিমুদ্দিন সাহেব বলছেন- উর্দুই পাকিস্তানের
একমাত্র রাষ্ট্রভাষা...।
জিন্নাহ সাহেব পেছনে থেকে প্রম্পট করছেন।
এই দৃশ্যটা শাসকদের কাছে সহনীয় ছিল না। এর ফলে
তারা 'জাতির পিতা'কে অপমান
করা হয়েছে বলে প্রচার শুরু করে
দেয়।"
কলকাতার বৈচিত্র্যময় জীবনপর্ব
১৯৪৮ সালের প্রথমার্ধে ঢাকায় চলে আসার পূর্ব পযর্ন্ত
কলকাতা জীবনপর্বে কামরুল
হাসানের সক্রিয়তা ছিল বহুমুখী। শিক্ষাগ্রহণ
ও শিল্পচর্চা ছাড়া এসময়ে তিনি ব্রতচারী আন্দোলনের
সাথে যুক্ত হয়েছেন, শরীরচর্চা
করেছেন, বিশ্বযুদ্ধকালে কলকাতাবাসীর
নিরাপত্তা বিধানের আগ্রহে এ আর পি তে যোগ
দিয়েছেন, শিশু-কিশোরদের সুনাগরিক
হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সংগঠিত
করেছেন মণিমেলা ও মুকুল ফৌজের পতাকাতলে। এ এক
বর্ণাঢ্য বিচিত্র আনন্দময় জীবন।
গণমুখী এসব সক্রিয়তায়
দেশাত্মবোধের জাগরণই ছিল মুখ্য।
শরীরচর্চা
কামরুল হাসান, অল্পবয়স হলেও, ১৯৩৫ সাল থেকে
নিয়মিত ব্যায়াম চর্চা শুরু করেন।
অগ্রজ আবুল হাসানাতকে দেখে
তিনি
এ-ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ হন। আবুল হাসানাত বাল্যকালে বহু
বাঙালির মতোই ভীষণ
ম্যালেরিয়ায় ভুগতেন। কোনো এক স্বজন
ব্যক্তির উপদেশে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যায়াম চর্চা শুরু
করে ম্যালেরিয়ার
অভিশাপ-মুক্ত হন। পাশাপাশি শরীরচর্চায় বিশেষ
পারদর্শিতার কারণে 'মিস্টার বেঙ্গল' (১৯৪০ ও ১৯৪১)
উপাধিও লাভ করেন। সেসময়
কলকাতা মাদ্রাসা সংলগ্ন মুসলিম
ইনস্টিটিউটের মিলনায়তনের পাশেই ছিল একটি আধুনিক
জিমনাসিয়াম। পাঁচটি আধুনিক
স্নানাগারসম্বলিত এই জিমনাসিয়াম
তৎকালীন কলকাতার সকল ব্যায়ামানুরাগীরই ঈর্ষার বস্তু
ছিল। ছাত্রদের জন্য ওই
জিমনাসিয়াম ছিল অবারিত। অগ্রজের
অনুগামী হয়ে কামরুল হাসান মুসলিম ইনস্টিটিউটের
জিমনাসিয়ামে যাতায়াত শুরু করেন।
কামরুল হাসান ১৯৪৫ সালে ইন্টার কলেজ বডি বিল্ডিং
প্রতিযোগিতায় 'বি' গ্রুপে প্রথম
স্থান অধিকার করেন । সে দিন ছিল
১৬ জানুয়ারী। এ দিনটিকে তিনি জীবনের একটি স্মরণীয়
দিন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কলকাতার ইউনিভার্সিটি
ইনস্টিটিউট
হলে এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম স্থান
অধিকারীকে বলা হতো 'বেঙ্গল
চ্যাম্পিয়ান'। তখন তিনি কলকাতা আর্ট স্কুলের
ছাত্র। কলকাতা আর্ট স্কুলের ইতিহাসেও এটি প্রথম
ঘটনা। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের
জন্য কলকাতার অনেক ধনীর সন্তান
গাড়িতে চড়ে, টার্কিস টাওয়েল, সুগন্ধি অলিভ আয়েল ও
সাহায্যকারীসহ উপস্থিত
হয়েছিল; আর কামরুল হাসান গিয়েছিলেন
ট্রামে চেপে, সঙ্গে নিয়েছিলেন একটি গামছা ও এক
শিশি খাঁটি সরিষার তেল। নিয়ম
ছিল, প্রতিযোগিতায় যারা বিজয়ী হবেন
তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক প্রতিযোগীর
পক্ষ থেকে কাপটি গ্রহণ
করবেন। কামরুল হাসানের সঙ্গে কোনো
শিক্ষক না থাকায় তিনি 'বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন' হলেও কাপ
ছাড়াই তাঁকে ব্যথাতুর মন
নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছিল। পরদিন (১৭
জানুয়ারী) আর্ট স্কুলে গিয়ে বিজয়ের সংবাদ দিয়ে
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে সঙ্গে
নিয়ে কাপ সংগ্রহ করেন। আর্ট স্কুলের
শিক্ষক হিসেবে জয়নুল আবেদিন কাপটি গ্রহণ করেছিলেন।
এর কয়েকদিনের মধ্যে দৈনিক
আজাদ পত্রিকায় এ সংবাদ
প্রকাশিত হয়। মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায়ও সংবাদটি
ছবিসহ ছাপা হয়েছিল।
ব্রতচারী আন্দোলন
কামরুল হাসান ব্রতচারী আন্দোলনে যোগ দেন ১৯৩৯
সালের ডিসেম্বর মাসে। তিনি যোগ
দিয়েছিলেন নিখিল বঙ্গ নবম
ব্রতচারী শিবিরে। ১৫ ডিসেম্বর ১৯৩৯ থেকে দেড়মাস
ব্যাপী এই শিবিরের আয়োজন করা
হয়েছিল দক্ষিণ কলকাতার
বালিগঞ্জ রেল স্টেশনের পূর্ব দিকের শহরতলি অঞ্চলে,
নাটোর মহারাজার তিনতলা
বাগানবাড়ি 'নাটোর পার্ক'-এ। এই শিবিরে
যোগদানসূত্রে কামরুল হাসান ব্রতচারী আন্দোলনের সঙ্গে
ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েন এবং
জীবনের শেষদিন পযর্ন্ত এই
আন্দোলনের আদর্শের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন।
ব্রতচারী আন্দোলনের পুরোধা গুরুসদয় দত্তকে কামরুল
হাসান আগে থেকেই চিনতেন এবং
অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। তিনি সব
সময়ই ব্রতচারী দলে যোগ দিতে চাইতেন। কামরুল
হাসানের কিশোরমনের সেই সুতীব্র
আকাঙ্ক্ষাটি পূরণ হলো ১৯৩৯
সালের
১৫ ডিসেম্বর তারিখে। একে তিনি জীবনের 'পরম
শুভক্ষণ' বলে আখ্যায়িত করেছেন। নবম
লিখিল বঙ্গ ব্রতচারী অনুশীলন
শিবিরের বিজ্ঞাপন পত্রিকায় বেরিয়েছিল। ব্যায়াম
শিক্ষক মোহাম্মদ তহম্মল হোসেন
বিজ্ঞাপন দেখে কামরুল হাসানকে
বললেন, "ব্রতচারী নাচটা ভালো করে শিখে এসো।"
কামরুল হাসান লিখেছেন, "দেড়
মাসের অনুশীলন শিবির, আমি এক
পায়েই দাঁড়িয়ে ছিলাম। পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপন
দেখলাম। দেড় মাসের জন্য
খাইখোরাকি ইত্যাদির জন্য লাগবে
সর্বসাকুল্যে বত্রিশ টাকা। নিজের বিছানাপত্র, সাবান,
দাড়ি শেভ করার সরঞ্জাম
ইত্যাদি এবং একটি কোদাল অবশ্যই
থাকতে
হবে। বাড়ীতে সম্মতিও নাই আপত্তিও নাই। মোট কথা
আমি তখন লায়েক হয়ে গেছি।"
কলকাতার ১২নং লাউডন স্ট্রিটে ছিল কেন্দ্রীয় ব্রতচারী
অফিস। কামরুল হাসান সেখানে
গিয়ে নির্ধারিত অর্থ জমা দিয়ে ফরম
পূরণ করে রেখে আসেন। ১৫ ডিসেম্বর (১৯৩৯) বিকেল
নাগাদ একটি মানুষ টানা রিকশায়
চেপে বিছানাপত্র, কাপড়চোপড়
ও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র নিয়ে বালিগঞ্জের নাটোর পার্কে
গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন
কামরুল হাসান। শিবিরে অংশগ্রহণকারী
আশিজনের দলটি না-কেরোসিন না-পেট্রোল 'ক্যারম
অয়েল' নামক এক ধরনের তেল
হাতেপায়ে মেখে বালিগঞ্জের
মশককুলের দংশন থেকে রক্ষা পেয়েছিল।
স্বাধীন দেশের মাটিতে ব্রতচারী আন্দোলনের আদর্শ
প্রসারের লক্ষ্যে তিনি নতুন করে
সচেষ্ট হন। এই প্রয়াসের অংশ
হিসেবেই
তিনি ১৯৭৩ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে মাসব্যাপী
ঢাকার শাহীন স্কুলে ব্রতচারী
ক্যাম্প-এর আয়োজন করেন। আশির
দশকেও যখন তিনি প্রাভাতিক বা বৈকালিক ভ্রমণে
বেরিয়েছেন, ঝোলায় ভরে নিয়েছেন
ব্রতচারী সখা গ্রন্থ। কিশোরদের তিনি
ব্রতচারী গান শুনিয়ে মুগ্ধ করে তাদের উপহার হিসেবে
দিয়েছেন এই গ্রন্থ।
এ আর পি
১৯৪২ সালের ২০ ডিসেম্বর কলকাতায় প্রথম জাপানি
বোমা বর্ষিত হয়। তারপর
২১,২৪,২৬ ও ২৮ ডিসেম্বর কলকাতার
হাতিবাগান, গ্রে স্ট্রিটের মোড়ে, বৌবাজার রাস্তায়,
ডালহৌসি স্কোয়ারে, খিদিরপুর
ডকে, বজবজে এবং কলকাতার বাইরে
বেলঘরিয়ায় জাপানি বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। বোমা
আতঙ্কে কলকাতা শহর থেকে
লোকজন ব্যাপকভাবে গ্রামমুখি হয়।
স্কুল-
কলেজ-অফিস বন্ধ হয়ে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে সৃষ্টি
হয় এ আর পি (এয়ার রেইড
প্রিকশন)। কলকাতা শহরে জাপানি
বোমা হামলার বিরুদ্ধে জনসাধারণকে সতর্ক করা এবং
তাদের আত্মরক্ষার সাহায্যার্থে
সরকার এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন
করেন।
সরকারের আবেদনে অনেকেই এ.আর.পি-র কর্মী হিসেবে
যোগ দিয়েছিলেন এবং এই
কর্মীদের ভিড়ে শিল্পগুরু কামরুল
হাসানও ছিলেন। কলকাতা শহর এমনভাবে খালি হয়ে গেল
যে তরুণ বয়সের কাউকে
কলকাতার পথে ঘাটে দেখাই যেত না।
দু-একজনের দেখা পাওয়া যেত এ.আর.পি, সিঙ্ক গার্ড,
ফায়ার ফাইটিং পার্টি অফিসের
আড্ডাখানায়। এ.আর.পিতে
যোগদানের ফলে কামরুল হাসান প্রতি মাসে পঁচাত্তর
টাকা এবং সরকারি রেশনে চালসহ
নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী
পেতেন। এসবে কাজ হচ্ছিল না। কামরুল হাসানের পিতা
তাঁকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।
তাঁকে গ্রামে পাঠানোর কথা
ভাবছিলেন।
পিতাকে কিভাবে নিরস্ত করবেন এ নিয়ে কামরুল
হাসানের মধ্যে দুশ্চিন্তা ছিল। বাদল
নামে এক বন্ধু এ-ব্যাপারে তাঁকে
উপায় বাতলে দিল, বলল, "এ.আর.পিতে তালিকাভুক্ত
হওয়ার সময় যে আইডেনটিটি
কার্ডখানা পেয়েছিস ঐটা তোর
বাবাকে
দেখিয়ে বলবি আমি কলকাতা ছাড়লে পুলিশ আমাকে গ্রাম
থেকে পাকড়াও করে নিয়ে
যাবে।" কামরুল হাসানের পিতা শুধু
সরকারি চাকুরে বলেই নয়, আইন-শৃঙ্খলার প্রতি
বিশেষভাবে শ্রদ্ধাশীল ছিলেন তাই এ
কথায় কাজ হয়েছিল।
রাজনৈতিক সংযোগ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে কামরুল হাসান নেতাজী
সুভাষচন্দ্র বসুর 'ফরোয়ার্ড ব্লক'-এ
যোগ দেন। সুভাষচন্দ্র বসুর
অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে আকৃষ্ট হয়েই তিনি এই দলের
সঙ্গে সংযুক্ত হন।
বিশ্বযুদ্ধকালের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে
নেতাজী
সুভাষচন্দ্র বসু গোপনে দেশত্যাগ করেন, ফরোয়ার্ড ব্লকে
কামরুল হাসানের বন্ধু-বান্ধবের
মধ্যে ১০/১২ জন গ্রেপ্তার হয়ে
কারারুদ্ধ হলে কামরুল হাসান একা হয়ে যান।
শুরু হয় ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ। এই দুর্ভিক্ষ নিয়ে
চিত্রশিল্পীরা ছবি আঁকেন। জয়নুল
আবেদিনের দুর্ভিক্ষ বিষয়ক চিত্রমালাই
সবচেয়ে বেশি খ্যাতি অর্জন করে। এসব চিত্র কমিউনিস্ট
পার্টির পত্রিকা peoples
war এবং জনযুদ্ধ-এ ছাপা
হয়।
কলকাতার কমিউনিস্ট পার্টি দুর্ভিক্ষ নিয়ে আঁকা
চিত্রকর্মের একটি প্রদর্শনীর আয়োজন
করে। প্রদর্শনী উপলক্ষে ছোট বড়
সকল
সচেতন শিল্পীই দুর্ভিক্ষ বিষয়ক চিত্রাঙ্কণে মনোনিবেশ
করেন। প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়
কলকাতার কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের
ইণ্ডাস্ট্রিয়াল মিউজিয়ামের পাশে মাঝারি আয়তনের
একটি ঘরে। কলকাতার সে সময়কার
নামী দামী সকল শিল্পীরই চিত্রকর্ম
ছিল প্রদর্শনীতে। জয়নুল আবেদিনই ছিলেন মধ্যমণি।
কামরুল হাসানের চিত্রও
প্রদর্শনীতে ছিল। আয়োজকদের মধ্যে যারা
ছিলেন তাদের মধ্যে কবি গোলাম কুদ্দুস, অধ্যাপক গোপাল
হালদার (১৯০২-৯৩), শম্ভু
মিত্র, বিজন ভট্টচার্য, তৃপ্তি মিত্র,
মণিকুন্তলা সেন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
এ সময়েই গড়ে উঠেছে আই.পি.টি.এ (গণনাট্য আন্দোলন)।
এই দুর্ভিক্ষকে কেন্দ্র করে
আই.পি.টি.এ-র উদ্যোগে
গণজীবনকেন্দ্রিক বিপ্লবাত্মক নাটক 'নবান্ন' মঞ্চস্থ
হলো কলকাতার মোহাম্মদ আলী
পার্কে। এই নাটক প্রথম যেদিন মঞ্চস্থ হয়
সেদিনের দর্শক সারিতেই জয়নুল আবেদিন ও কামরুল
হাসান উভয়েই ছিলেন। গণনাট্য
সংঘের প্র্রতিটি সভা, সাংস্কৃতিক
অনুষ্ঠান বা আলোচনায় জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসান
উভয়েই ছিলেন। গণনাট্য সংঘের
প্রতিটি সভা, সাংস্কৃতিক
অনুষ্ঠান বা আলোচনায় জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসান
উভয়ে আমন্ত্রিত হতেন।
১৯৪৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে কলকাতায় এক
সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সরোজিনী
নাইডু এ সম্মেলনের উদ্বোধন
করেন। এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কামরুল হাসান উপস্থিত
ছিলেন। সম্মেলন উপলক্ষে একদিন
গানের জলসা বসে।
গণসংগীতের
সেই আসরের হাজার হাজার দর্শক শ্রোতার মধ্যে কামরুল
হাসানও ছিলেন।সে সময়ে জয়নুল
আবেদিন আর্ট স্কুলের শিক্ষক
এবং কামরুল হাসান সেই স্কুলের ছাত্র। তৎসত্ত্বেও জয়নুল
আবেদিনের সঙ্গে কামরুল
হাসানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
কলকাতার ১৪নং সার্কাস রোডের এক কক্ষবিশিষ্ট এক গৃহে
ছিল জয়নুল আবেদিনের বাস।
সেই গৃহে কামরুল হাসানের
নিয়মিত যাতায়াত ছিল।
১৯৪৬ সালের ১৬ থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত কলকাতার বুকে
সংঘটিত হয় ইতিহাসের জঘন্যতম
ববরর্তার ঘটনা। সাম্প্রদায়িক
দাঙ্গায় হিন্দু মুসলমান পরস্পর রক্তে রঞ্জিত করে তাদের
হাত। পরবর্তী এক বছর ধরে
অব্যাহত থাকে এই অবিশ্বাস ও
হিংসার রেশ, এক ধরনের অস্বাভাবিক পরিবেশ। কামরুল
এ সময়ে নিরীহ জনতাকে রক্ষা
করার জন্য জীবনের ঝুঁকি
নিতেও
দ্বিধা করেন নি। এসময়ে তাদের বাসা ছিল ৬৭/১
বেনিয়াপুকুর লেন-এ। বেনিয়াপুকুর
লেন এবং তৎপার্শ্ববর্তী তাঁতিবাগান ও
হাতিবাগান ছিল মুসলিম প্রধান এলাকা। ওই এলাকার
শান্তিপ্রিয় মুসলমানদের,
দাঙ্গাপ্রিয় উগ্র হিন্দুদের হাত থেকে, বাঁচানোর
জন্য কামরুল হাসান পাড়ার অন্য যুবকদের নিয়ে রাত
জেগে নিয়িমিত পাহারার ব্যবস্থা
করেছিলেন। অন্য একটি ঘটনার
ক্ষেত্রেও তাঁর সাহসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। কামরুল
হাসানের বোন সখিনা খাতুনের
বিয়ে হয় ১৯৪৬ সালের জুন মাসে।
বিয়ের মাস দুয়েক পরে তাকে দেখতে কামরুল হাসান
বোনের শ্বশুরবাড়ি নবদ্বীপে গেলে
সেখানেও দাঙ্গা পরিস্থিতির সম্মুখীন
হন। সখিনা রহমানের শ্বশুরের আর্থিক সচ্ছলতা ও
সামাজিক প্রতিপত্তি ছিল। এলাকার
হিন্দু সম্প্রদায়ের উগ্রপন্থীরা সখিনা
রহমানের শ্বশুরবাড়ি আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলে ওই
বাড়ির লোকেরাও আত্মরক্ষার ব্যাপক
প্রস্তুতি নেয়। কামরুল হাসানকে
দায়িত্ব দেওয়া হয় একেবারে সামনে, বাড়ির গেটে।
তলোয়ার হাতে তিনি সেখানে
থেকে বাঁশি বাজিয়ে গৃহের লোকদের সতর্ক
করার দায়িত্ব নেন এবং সফলভাবে তা পালন করেন। তবে
দাঙ্গাকারীরা আক্রমণের
প্রস্তুতি নিয়ে এসেও শেষ পর্যন্ত সন্ধি
স্থাপন করে।
মণিমেলা ও মুকুল ফৌজ
মণিমেলা ও মুকুল ফৌজ এই দুই শিশুকিশোর সংগঠনের
সঙ্গেই কামরুল হাসান ঘনিষ্ঠভাবে
যুক্ত ছিলেন। 'মুকুল ফৌজ'-এর
প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। ১৯৪১ সালে
দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার
ছোটদের পাতা আনন্দমেলার সভ্যদের
নিয়ে
সারা ভারতে গড়ে উঠেছিল শিশুদের সংগঠন 'মণিমেলা'।
শিশুসাহিত্যিক বিমল ঘোষ
'মৌমাছি' ছদ্মনামে আনন্দমেলার
পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। এর আগে
একমাত্র ইংরেজি পত্রিকা
স্টেটসম্যান-এ ছোটদের জন্য 'বেনজি লীগ'
নামে প্রতি রোববারে একটি বিশেষ পৃষ্ঠা বের হতো।
তারই অনুসরণে আত্মপ্রকাশ করে
'আনন্দমেলা'। ছোটদের জন্য বাংলা
দৈনিকের এই প্রচেষ্টা স্বাভাবিকভাবে বাংলা
ভাষাভাষি শিশু-কিশোরদের মনে বিপুল
সাড়া জাগায়। তখনকার অখণ্ড বাংলার
এমন কোনো মহকুমা শহর ছিল না যেখানে মণিমেলার
শাখা সংগঠিত হয়নি।
কামরুল হাসানের সাংগঠনিক দক্ষতায় মুকুল ফৌজের
কার্যক্রম দ্রুত প্রসার লাভ করে।
বর্তমান বাংলাদেশে কামরুল
হাসানের
জনপ্রিয়তার একটি অন্যতম কারণ এই মুকুল ফৌজ সংগঠন।
বিজ্ঞানী ড. আবদুল্লাহ আল মুতী
শরফুদ্দীন, সাহিত্যিক সৈয়দ
শামসুল হক (জ. ১৯৩৫), সাংবাদিক ও সংগীতশিল্পী
ওয়াহিদুল হক (জ. ১৯৩৩) প্রমুখ এই
সংগঠনের সদস্য ছিলেন এবং
এ নিয়ে তাঁরা লিখেছেনও। বাংলাদেশের বহু জেনারেলও
কিশোর বয়সে কামরুল হাসানের
কাছে পিটি ট্রেনিং লাভের কথা
স্বীকার করেছেন। এঁদের মধ্যে জেনারেল দাস্তগীর,
এয়ার ভাইস মার্শাল এ.জি.
মাহমুদ, ব্রিগেডিয়ার সালাউদ্দিন মাসরুরুল
হক প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। মুকুল ফৌজের সঙ্গে কামরুল
হাসানের সম্পর্কের বিষয়টি
কলকাতা-পর্বেই শেষ হয়ে যায়নি। ঢাকায়
আসার পরও তিনি এই সংগঠনের কাযর্ক্রমের সঙ্গে যুক্ত
ছিলেন।
ঢাকা আগমন
কামরুল হাসান কলকাতার 'গভর্নমেন্ট স্কুল অফ আর্টস'
থেকে ছ'বছরের কোর্স সমাপ্ত
করেন ১৯৪৭ সালের প্রথমার্ধে। ওই বছর
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির শাসন থেকে মুক্ত হয়ে সমগ্র
ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ
করে। ঔপনিবেশিক শাসনমুক্তির পাশাপাশি
একই সঙ্গে এ অঞ্চলে সৃষ্টি দুই রাষ্ট্র- ভারত ও
পাকিস্তান। এই প্রক্রিয়ায় বাংলা,
পাঞ্জাব ও কাশ্মীর দ্বিধাবিভক্ত হয়। বাংলা
বিভক্তির ফলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বহু মুসলিম পরিবারেরই
আগমন ঘটে পূর্ববাংলায়। কামরুল
হাসানের পরিবারও পূর্ববাংলায়
আসার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে
১৯৪৭ সাল পার হয়ে যায়।
ঢাকায় বসবাস
১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে কামরুল হাসান ঢাকা এসে
প্রথমে ওঠেন প্রখ্যাত
সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দীনের
কলতাবাজারের বাসায় এবং সেখানেই তিনি পাঁচ-ছ-মাস
ছিলেন। ১৯৪৮ সালের ১ জুন
কামরুল হাসানের পিতৃবিয়োগ ঘটে
কলকাতায়। এরপরে তাঁর বিমাতা ও ছোট ভাইবোনেরা
কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন।
ঢাকার মুন্সিগঞ্জে বাসা খুঁজে সেখানেই
তাদের বসবাসের ও পড়াশুনার ব্যবস্থা করা হয়। মুকুল
ফৌজের বন্ধুরা মুন্সিগঞ্জে বাসা
খুঁজে দেওয়ার ব্যাপারে বিশেষভাবে
সহায়তা করে। এক্ষেত্রে সাহিত্যিক ও সাহিত্য পত্রিকার
সম্পাদক মীজানুর রহমানের (জ.
১৯৩১) খালাতো ভাই নয়ীম গহরের
সহায়তার কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুন্সিগঞ্জে
প্রশাসনের কাছ থেকে অনুমতি
নিয়েহিন্দুদের একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে
কামরুল হাসানের পরিবারের সদস্যদের থাকার ব্যবস্থা
করা হয়। কামরুল হাসান প্রতি
শনিবার ঢাকা থেকে মুন্সিগঞ্জ যেতেন
পরিবারের দেখাশোনার জন্য।
ঢাকা আর্ট গ্রুপ ও শিল্প প্রদর্শনী
সে সময়কার পরিস্থিতি শিল্পকলা চর্চার অনুকূল ছিল না।
পুরান ঢাকায় রক্ষণশীল
সর্দারদের আধিপত্য ছিল প্রবল। এদের
কারণে গোঁড়া মৌলভী ও পীর নামধারী কিছু ধর্মব্যবসায়ী
ফতোয়া দেবার অবাধ অধিকার
লাভ করেছিল। লালবাগের এমন
এক ধর্মব্যবসায়ীর ঘাঁটি থেকে কেবল ছবি আঁকার বিরুদ্ধে
ফতোয়াই দেওয়া হয়নি,
রাস্তায় রাস্তায় পোস্টারও সাঁটা হয়েছিল।
শুধু চারুশিল্প না, সুস্থ সংস্কৃতি চর্চায়ও তখন বাধা আসত
এসব মহল থেকে। বিশেষ করে
রবীন্দ্র সংগীতের আসর বসলে
হামলার আশংকায় বাইরে তরুণদের পাহারা বসাতে হতো।
এ ধরনের পরিবেশে ১৯৫০ সালে
মুসলিম লীগের ষড়যন্ত্রে ঢাকায়
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বেধে যায়। উগ্র মুসলমানদের হাত
থেকে হিন্দু সম্প্রদায়কে
বাঁচানোর জন্য কামরুল হাসান স্থানীয়
যুবকদের
নিয়ে ওয়ারি এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করেছিলেন।
এসব প্রতিকূলতার মধ্যেই ১৯৫০
সালে এখানকার শিল্পীরা আর্ট
ইনস্টিটিউটের বাইরে শিল্প আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়ার
লক্ষ্যে গড়ে তোলেন 'ঢাকা আর্ট
গ্রুপ'। জয়নুল আবেদিন এই গ্রুপের
সভাপতি এবং কামরুল হাসান সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৬০ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি শিল্প প্রদির্শনীতে
তিনি অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৪
সালে ঢাকায় কামরুল হাসানের একটি
একক শিল্পকলা প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ১৯৬৯
সালে রাওয়ালপিণ্ডি সোসাইটি অফ
কনটেমপোরারি আর্ট গ্যালারিতে
তাঁর একটি একক শিল্প প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
ষাটের দশকের শেষদিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান
সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে
কাজী নজরুল ইসলামের ওপর
একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়। এই প্রামাণ্যচিত্রের
পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন
অভিনেতা আবুল খায়ের। এই প্রামাণ্যচিত্রের
জন্য ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ওপর ইতিহাসভিত্তিক
বড়ো আকারের কিছু শিল্পকর্ম অঙ্কন
করতে হয়। শিল্পী জয়নুল
আবেদিন ও শিল্পী কামরুল হাসান এসব শিল্পকর্ম অঙ্কনে
মূল দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে শিল্পী কামরুল হাসানের বেশ
কয়েকটি একক শিল্প প্রদর্শনী
অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া যৌথ প্রদর্শনীতে
তাঁর
অংশগ্রহণ অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী
তাঁদের পোস্টকার্ড ফোলিও
সিরিজ প্রকাশের দ্বিতীয় পর্বে শিল্পী
কামরুল হাসানের শিল্পকর্ম অবলম্বনে ষোলটি পোস্টকার্ড
প্রকাশ করে। এই ফেলিও-র
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি অংশে উল্লেখ করা
হয়, ১৯৭৩ সালে ঢাকা কলেজ অফ আর্টস অ্যাণ্ড
ক্র্যাফটস-এ তাঁর একটি একক প্রদর্শনী
অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে। শিল্পকলা একাডেমীতে কামরুল
হাসানের একটি একক শিল্প
প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এই
প্রদর্শনীটি ছিল নানা দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছিল ১৯৪৩ সাল
থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তাঁর আঁকা
১৫৬টি শিল্পকর্ম।
আর্ট ইনস্টিটিউট : প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম
১৯৪৭ সালে শুরুর দিকেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের ও বাংলা
বিভক্তির বিষয়টি মোটামুটি
নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। আরও নিশ্চিত হয়ে
উঠেছিল, পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্বাংশের রাজধানী হবে
ঢাকা। কলকাতা আর্ট স্কুলের
শিক্ষকদের মধ্যে জয়নুল আবেদিন,
সফিউদ্দীন আহমেদ, আনোয়ারুল হক প্রমুখ ভবিষ্যৎ নিয়ে
পরিকল্পনা করেছিলেন- ঢাকা
আসবেন, ঢাকায় একটি আর্ট স্কুল
প্রতিষ্ঠা করবেন ইত্যাদি। কামরুল হাসান তখনও ছাত্র।
কিন্তু শিক্ষকদের এসব
আলোচনা-পরিকল্পনা সম্পর্কে অনবহিত
ছিলেন না। এঁদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং
স্কুলের বাইরে নানা কাজে
কামরুল হাসান এঁদের সঙ্গী থাকতেন। ফলে
কামরুল হাসানও মোটামুটিভাবে এসব আলোচনা পরিকল্পনার
সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত
ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি
স্মৃতিচারণা
করে বলেছেন, শিল্পীদের এই পরিকল্পনা যাতে
বাস্তবায়িত হয় সে ব্যাপারে কলকাতা
অবস্থানকালেই সরকারি কর্মচারীদের
মধ্য থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন বৈজ্ঞানিক
ড. কুদরাত-এ খুদা, সলিমউল্লা
ফাহমি, আবুল কাশেম প্রমুখ।
পূর্ববাংলায় প্রশাসনের মধ্য থেকে এঁদেরই সক্রিয়
সহযোগিতায় ১৯৪৮ সালে ঢাকায় আর্ট
স্কুল প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল।
আর্ট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য যেমন আন্দোলন করতে
হয়েছে তেমনি এই প্রতিষ্ঠানকে
যুগোপযোগী করে তোলার জন্যও
কম
পরিশ্রম করতে হয়নি। এছাড়া এই প্রতিষ্ঠানের বাইরে
চারুশিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার
জন্যও সে সময়কার উদ্যোগী
শিল্পীবৃন্দ প্রচুর সময় ও মেধা ব্যয় করেন। এসব শিল্পীর
মধ্যে কামরুল হাসানের অগ্রণী
ভূমিকা ছিল।
১৯৬০ সালের ১৬ মার্চ তারিখে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প
সংস্থার ডিজাইন সেন্টারে চিফ
ডিজাইনার হিসেবে যোগদান করেন।
কেন
তিনি শিক্ষকতার পেশা ত্যাগ করলেন কিংবা যে
প্রতিষ্ঠানের (গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট
অফ আর্টস) প্রতিষ্ঠা ও তাকে গড়ে
তোলার পেছনে ছিল তাঁরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সেই
প্রতিষ্ঠানই-বা কেন ছাড়লেন তার
সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো
ভাষ্য পাওয়া যায় না। তবে যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়ার
ব্যাপারে কোনো গূঢ় অভিমান
হৃদয়মধ্যে হয়ত লুকিয়ে ছিল- এমন
অনুমান অনেকেই করেন।
শিল্পী কামরুল হাসানের নেতৃত্বেই ডিজাইন সেন্টারটি
প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সেন্টারের
কাজ প্রথমে শুরু হয় মগবাজারের একটি
বাড়িতে। কামরুল হাসান লিখেছেন, "কয়েকটি মাত্র
চেয়ার-টেবিল নিয়ে ডিজাইন
সেন্টার আরম্ভ হলো মগবাজারের
বাড়িতে।
চেয়ার-টেবিলও সকলের জোটেনি তখন। শিল্পী কাইয়ুম
চৌধুরী এবং শিল্পী ইমদাদ হোসেন
ঘরের মেঝেতে বসেই সে সময়
কাজ করতেন। ১৯৬২ সালের শেষের দিকে ডিজাইন
সেন্টার মতিঝিলের বর্তমান এবং তার
নিজস্ব ভবনে প্রতিষ্ঠিত হয়।
মাঝে
অবশ্য এক বছরের জন্য বড় মগবাজার থেকে আউটার
সার্কুলার রোডের একটি ভাড়াটে
বাড়ীতে ডিজাইন সেন্টার
স্থানান্তরিত
হয়েছিল।" ১৩৭-১৩৮ নম্বর মতিঝিলে নকশা কেন্দ্রের
ভবনটি ফোর্ড ফাউন্ডেশনের আর্থিক
অনুদানে প্রথমে তিনতলা পর্যন্ত
নির্মিত হয়। বর্তমানে এটি আটতলা বিশিষ্ট ভবন। পূর্ব
পাকিস্তান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প
সংস্থার (ইপসিক) লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের
সঙ্গে নকশা কেন্দ্রের কার্যক্রমের সাদৃশ্য থাকায় ষাটের
দশকেই সরকারি নির্দেশে
ইপসিকের কার্যালয় নকশা কেন্দ্রের এই
ভবনে স্থানান্তরিত হয়।
ডিজাইন সেন্টারে যোগদানের ফলে শিল্পী কামরুল হাসান
আরও ঘনিষ্ঠভাবে লোকশিল্প ও
হস্তশিল্পের জগতের সঙ্গে
পরিচিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। ব্রতচারী আন্দোলনে
যুক্ত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের
লোকঐতিহ্যের প্রতি যে শ্রদ্ধা ও
ভালোবাসা তাঁর মনে জন্ম নিয়েছিল, ডিজাইন সেন্টারে
যোগদানের পর লোকশিল্প ও
হস্তশিল্পের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে এসে তা
আরও বিকশিত হয়। আবদুল হাফিজের ভাষায়, "পুতুল তৈরি,
ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্পের
ডিজাইন, মাটির তৈরি সব রকমের
শিল্প, বাঁশ ও বেতের কাজ, শোলার কাজ, নকশী পিঠে ও
পিতল-কাঁসার কাজ এবং
বাংলাদেশের দেউল-মন্দিরের
কারুকাজ প্রভৃতি দেখে তিনি বিসিকের ডিজাইন
সেন্টারকে সমৃদ্ধ করতে পেরেছিলেন,
অন্যদিকে লোকশিল্পের ডিজাইন
তাঁর
নিজস্ব চিত্রকর্মে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে।"
কামরুল হাসান ডিজাইন সেন্টারের
দায়িত্ব লাভ করে লোকশিল্প ও
লোকসংস্কৃতির বিকাশে আত্মনিয়োগ করেন। কাইয়ুম চৌধুরীর
ভাষায়, "ডিজাইন সেন্টারে
চাকরিতে বহাল থাকাকালীন
কামরুল ভাই এ সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের
লোকশিল্পের সঙ্গে তাঁর একটা যোগসূত্র
স্থাপিত হয়েছিল এবং লোকশিল্পীদেরও সান্নিধ্যে তিনি
এসেছিলেন। বহুস্থানে
সরকারিভাবে এবং ব্যক্তিগত পর্যায়েও তিনি
বিলুপ্তপ্রায় লোকশিল্পের বিলুপ্তিরোধে আর্থিক সহায়তা
দান করেছেন।
বাংলাদেশের চিত্রকলা আন্দোলনে এই ডিজাইন সেন্টারের
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা কামরুল
হাসান নিজেই উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেছেন, "বাংলাদেশে চারু ও কারুকলার ক্ষেত্রে
অবদানের কথা বিচার করলে
কলাভবনের পরেই ডিজাইন সেন্টারের
অবস্থান। যদিও ডিজাইন সেন্টার কেবল কারুশিল্পের
প্রসারের জন্যই প্রতিষ্ঠিত হয়।
দেশে-বিদেশে এবং বিভিন্ন বিপণি
কেন্দ্রে, বিশেষ করে কারুশিল্পের সংগ্রহশালাগুলোতে
প্রচুর সংখ্যক 'ছিকা' দেখা যায়।
লক্ষ লক্ষ টাকার ছিকা বিদেশে রপ্তানি
করা হয়েছে। এর পেছনে মূলত ডিজাইন সেন্টারের
প্রচেষ্টাই অলক্ষ্যে কাজ করছে।
স্বাধীনতা-উত্তরকাল
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষার্ধে ঢাকা ফিরে
কামরুল হাসান সদ্য স্বাধীন দেশ
গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
শিল্পী
হিসেবে এ পর্যায়ে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
কাজ-বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার চূড়ান্ত
নকশা অঙ্কন। ১৯৭১ সালের মার্চ
মাসে
সংগ্রামী ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের যে
জাতীয় পতাকা ওড়ানো হয়েছিল
সেই পতাকার প্রয়োজনীয় পরিবর্তন
এনে
তিনি বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় পতাকার রূপ দেন।
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার পাশাপাশি তিনি
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সরকারি
প্রতীকেরও ডিজাইন করেন। এছাড়া তাঁর
উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ বিমান,
বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ
পর্যটন করপোরেশন ও মুক্তিযোদ্ধা
কল্যাণ ট্রাস্টের প্রতীক অঙ্কন। বাংলাদেশের
সংবিধানের কভার ডিজাইনেরও রূপকার
তিনি।
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী
ইন্দিরা গান্ধীর আগমন উপলক্ষে
ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মঞ্চ তৈরি
করা হয়। এই মঞ্চ পরিকল্পনা ও তৈরির দায়িত্ব দেওয়া
হয় শিল্পী কামরুল হাসানকে।
তাঁর ইচ্ছা ছিল শাপলা ফূলের
নকশায়
মঞ্চ তৈরি করবেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের
(১৯২০-৭৫) ইচ্ছা ছিল
অন্যরকম। শেষে বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছা অনুযায়ী
নৌকার নকশায় তিনি মঞ্চ সজ্জিত করেন। ১৯৭২ সালের
২১ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠান ও
সাজসজ্জার পরিকল্পনা করা হয়
অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে। ১৯৭০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে
তিনি যে অক্ষরবৃক্ষ
সাজিয়েছিলেন, ১৯৭২ সালে তার পুনরাবৃত্ত
করা হয়।
বিসিক
স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে কামরুল হাসান তাঁর চাকুরিস্থল
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প
সংস্থাকে (বিসিক) বাংলার লোকশিল্প ও
কারুশিল্প বিকাশের ব্যাপারে পূর্ণতরভাবে কাজে লাগাতে
প্রয়াসী হন। জামদানি শাড়ির
উন্নয়ন ও বিকাশেও তিনি বিপুল অবদান
রাখেন। জামদানি শাড়ির বহুবিধ ব্যবহারের ধারণাটিও
তাঁরই সৃষ্টি। বিসিকে
চাকুরিকালে কামরুল হাসান হস্তশিল্প পণ্য বিশেষ
করে মৃৎশিল্প, চর্ম এবং বস্ত্রজাত পণ্য এবং পুতুল তৈরির
ক্ষেত্রে আরও নতুন নতুন নকশার
উদ্ভাবন অব্যাহত রাখেন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার বিপণন
কার্যক্রমকে সহায়তা করার জন্য ১৯৭৬
সালে বিসিকে বিপণন বিভাগ নামে
একটি নতুন বিভাগ চালু করা হয়। বিপণন বিভাগ ও নকশা
কেন্দ্রকে সুষ্ঠুভাবে
পরিচালনার স্বার্থে একটি পরিচালকের পদ সৃষ্টি
করা হয়। শিল্পী কামরুল হাসান নকশা কেন্দ্রের প্রধান
নকশাবিদের পদ থেকে বিপণন ও
নকশা কেন্দ্রের সমন্বয়ে সৃষ্ট নতুন
বিভাগের পরিচালক নিযুক্ত হন। ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে
অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত
তিনি এই পরিচালকের পদে নিয়োজিত
ছিলেন।
রূপায়ণ
ষাটের দশকে কামরুল হাসান ও তাঁর স্ত্রী ৩৪
নিউমার্কেটে একটি শাড়ির দোকান গড়ে
তোলেন। এর নাম ছিল 'রূপায়ণ'।
নিজেদের উদ্যোগে শাড়ি প্রিন্ট করার ব্যবস্থাও করা
হয়েছিল। ১ নম্বর ভিতরবাড়ি
লেনের যে বাড়িতে কামরুল হাসান
দীর্ঘদিন
বসবাস করেছেন সেই বাড়ির নিচতলায় একটি প্রিন্টিং
ফ্যাক্টরি চালু করা হয়। কামরুল
হাসানের স্ত্রী মরিয়ম বেগমই মূলত
দোকান ও ফ্যাক্টরীর কাজ দেখাশোনা করতেন। কিছু কাজ-
যেমন ডিজাইন করা ইত্যাদি
করতেন কামরুল হাসান। শাড়ির
ডিজাইনের মধ্য দিয়ে যেমন নতুন ফ্যাশন চালু করার
প্রয়াস থাকত, তেমনি থাকত
বাঙালি ঐতিহ্য ভালোভাবে ফুটিয়ে
তোলার আন্তরিকতা। বাঙালি মধ্যবিত্তের ওপর এসব
ডিজাইন সুগভীর প্রভাব বিস্তার
করে। কামরুল হাসান শুধু রুচি
বদলাতেই চান নি, তিনি রাজনৈতিক স্রোতের সঙ্গে
অগ্রসর হতেও চেয়েছিলেন। এ
ব্যাপারে কাইয়ুম চৌধুরীর বক্তব্যও
প্রণিধানযোগ্য, "রূপায়ন নামে একটি শাড়ি নকশা
কেন্দ্রও তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
ছাপা শাড়িতে রুচি এবং বাঙালি
সংস্কৃতি
সম্পর্কে সচেতনতা নারীজাতির মধ্যে সঞ্চারিত করাই
ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। নকশী কাঁথার
নকশা, আলপনা এবং লোকজ
নকশাকে এই নতুন মাধ্যমে তিনি পরিচিত করালেন।"
সাংস্কৃতিক আন্দোলন
'গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অফ আর্ট'-এ শিক্ষকতায়
নিয়োজিত থেকেও কামরুল হাসান এ
দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর
ঘনিষ্ঠ সংযুক্তি অব্যাহত রেখেছেন। রাজনৈতিক সচেতনতা
ও সামাজিক দায়িত্ববোধই
তাঁকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বরাবর
সক্রিয় রাখে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর
চট্টগ্রামের প্রগতিশীল সংস্কৃতিকর্মীরা
দুটি সংগঠন গড়ে তোলেন। একটি :
সংস্কৃতি পরিষদ, অন্যটি : প্রান্তিক। এই দুই সংগঠনের
যৌথ উদ্যোগে ১৯৫১ সালের
১৬-১৭ মার্চ চট্টগ্রামের হরিখোলা মাঠে
পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সম্মেলন উপলক্ষে একটি
চিত্রকলা প্রদর্শনীরও ব্যবস্থা করা হয়।
জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, সফিউদ্দীন আহমদে,
আনোয়ারুল হক প্রমুখের চিত্রকর্ম এ
প্রদর্শনীতে স্থান পায়।
১৯৫২ সালে এদেশে প্রথম রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী পালনের
অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন শিল্পী
কামরুল হাসান। উদ্যোক্তাদের মধ্যে
আরও ছিলেন অধ্যাপক অজিত কুমার গুহ, জহুর হোসেন
চৌধুরী প্রমুখ। ১৯৫২'র ভাষা
আন্দোলনে আর্টস ইনস্টিটিউটের
ছাত্র
আমিনুল ইসলাম, মুর্তজা বশীর, ইমদাদ হোসেন, রশীদ
চৌধুরী প্রমুখ সক্রিয় ছিলেন। এঁরা
পোস্টার লিখেছেন। তাঁদের তুলির
বলিষ্ঠ রেখার পোস্টার শিক্ষাঙ্গনে, রাস্তায়, গলিতে
সেঁটে দিয়ে ভাষা আন্দোলনকে
আরও সজীব ও বেগবান করা হয়েছে।
লেখা
হয়েছে স্লোগান ও দাবি সম্বলিত ব্যানার।
ছাত্র-শিল্পীদের সঙ্গে কামরুল হাসানও
সেদিন এসব কাজে সত্রিয়
ছিলেন।
১৯৫২ সালের প্রথম দিকে কুমিল্লার প্রগতিশীল
সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীরা
একত্রিত হয়ে 'কুমিল্লা প্রগতি মজলিস' নামে
একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠনের
উদ্যোগে ১৯৫২ সালের ২২ থেকে ২৪
আগস্ট কুমিল্লা শহরে 'পূর্ব
পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলন'-এর আয়োজন করা হয়। এই
সম্মেলনে কামরুল হাসান 'পূর্ব
বাংলার চিত্রশিল্প' শিরোনামে
একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। কামরুল হাসান লিখেছেন, "ওই
সাংস্কৃতিক সম্মেলনে শিল্প
প্রদর্শনী ছিল এক বিশেষ আকর্ষণ।
প্রদর্শনীতে ছবি দিয়েই শিল্পীরা তাঁদের দায়িত্ব শেষ
করেননি। বরং দলবদ্ধভাবে
সম্মেলনকে সার্থক করে তোলার জন্য সব
রকম প্রচেষ্টার সঙ্গে তাঁরা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত
ছিলেন।"
কমার্শিয়াল কাজ
এদেশের শিল্পচর্চা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে কামরুল
হাসান যেমন বরাবর প্রথম সারির
সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছেন,
তেমনি ব্যবহারিক শিল্পচর্চার ধারায়ও তিনি ছিলেন
পথিকৃতের ভূমিকায়। চল্লিশের
দশকে কলকাতায় শিল্পী জয়নুল
আবেদিন, কিংবা তারও আগে থেকে শিল্পী আবুল কাশেম,
কিছু বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকা বা
পত্রিকার অঙ্গসজ্জার কাজে যুক্ত
থাকলেও বিভাগোত্তর পূর্ববাংলায় কামরুল হাসানই ছিলেন
একক ও সর্বেসর্বা। কিছুটা
আর্থিক প্রয়োজনও এর সঙ্গে জড়িত
ছিল।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, কামরুল হাসান 'গভর্নমেন্ট
ইনস্টিটিউট অফ আর্টস' এ শিক্ষকতার
চাকুরি করে যে বেতন পেতেন তাতে
তাঁর পারিবারিক দায়িত্ব পালন সুসম্পন্ন হতো না। তিনি
নিজে তখনও অবিবাহিত
থাকলেও বিমাতাসহ ছোট ভাইবোনের এক
বড়ো পরিবারের দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর।
১৯৪৮-৫৯ সময় পর্বে তাঁর কমার্শিয়াল কাজের পরিধি
সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য পাওয়া
যায়। কামরুল হাসানের বন্ধু শিল্পী
খালেদ চৌধুরী ১৯৪৯ সালে ঢাকা এসেছিলেন। কামরুল
হাসান তখন ৩৬ নম্বর র্যাংকিন
স্ট্রিটের ভাড়া বাসায় থাকেন। খালেদ
চৌধুরী সেখানে পরম অভিনিবেশ সহকারে একটি
বর্ণমালার বই অলংকরণ করতে তাঁকে
দেখেছিলেন। খালেদ চৌধুরী
লিখেছেন, "দেশভাগের পর কামরুল যখন ঢাকাতে গিয়ে
আস্তানা গাড়লো তখন ঢাকায়
জনসন রোডে সবে আর্ট স্কুলের পত্তন
হয়েছে। ওখানেই শিক্ষকতার কাজ পেয়ে গেল। সঙ্গে
সঙ্গে সাংসারিক দায়িত্বও
বর্তালো। তাই বইয়ের কাজ কিছু করতে
হতো
যদিও সে সময় কমার্শিয়াল কাজের কোন বাজারই ছিল না
ঢাকায়। কদাচিৎ দু-একটা
বই-এর অলংকরণ অথবা প্রচ্ছদ।
কমার্শিয়াল কাজ করলেও ঐ মানসিকতা ওর একেবারে ছিল
না। কমার্শিয়াল কাজের রুচির
সঙ্গে ওর কাজের রুচির পার্থক্য
ছিল বিস্তর।"
শিক্ষকতা
'গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অফ আর্টস'-এ কামরুল হাসান
এগারো বছরেরও অধিককাল
শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন। শিক্ষক
হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন তার কিছু পরিচয় আমরা তাঁর
ছাত্রদের স্মৃতিচারণ থেকে
জানতে পারি। কাইয়ুম চৌধুরী
লিখেছেন, "১৯৪৯ সাল। তখনো কামরুল ভাইয়ের গায়ে
ছাত্রের গন্ধ। হাতে স্কেচখাতা
নিয়ে ঘোরেন। যখন যা পান এঁকে
ফেলেন। আমরা রেহাই পাই না। সামনে বসিয়ে পেন্সিলে
পোর্টেট। কি অসাধারণ
পেন্সিলের টান-টোন... প্রি-ডিগ্রীতে কামরুল
ভাই আমাদের স্কেচ দেখতেন। প্রতিদিন সকালে তাঁর
টেবিলে জমা দিতে হতো স্কেচ
খাতা। একে একে ডাক দিয়ে সবার ভুল-
ত্রুটি দেখিয়ে দিতেন। মাঝে মাঝে আউটডোর স্কেচ।
সেদিন খুব আনন্দ হতো। কামরুল
ভাই-এর নেতৃত্বে বেরিয়ে পড়তাম ছবি
আঁকতে। পেন্সিলে অথবা কালিকলমে কোথাও পুরনো বটের
গুঁড়ি, মাটি-কামড়ানো শেকড়ের
সর্পিল গতি, আলো-আঁধারিতে
বেশ রহস্যময়, ফুটিয়ে তুলতে হতো কাগজে। কামরুল ভাই
ক্যানভাসের স্কেচটুল নিয়ে
নিজেও বসে যেতেন। তাঁর বিষয়বস্তু
আমরা।"
শিল্পী রফিকুন নবী যখন আর্ট ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন
তখনও কামরুল হাসান সেখানকার
শিক্ষক। এর বছরাধিকাল পরেই
তিনি ডিজাইন সেন্টারে যোগ দেন। তবে কামরুল হাসান
তখন ওপরের ক্লাসে কমার্শিয়াল
বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তাই
সরাসরি তাঁর ছাত্র ছিলেন না রফিকুন নবী। তবে
নির্ধারিত শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে
উপরের ক্লাসের কোনো কোনো শিক্ষক
তাঁদের ক্লাসে আসতেন। দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময়
এভাবেই একদিন রফিকুন নবী শিল্পী
কামরুল হাসানের শিক্ষকতার
পরিচয়
লাভ করেছিলেন। তাঁর ভাষায়, "এমনি একদিন হুট করে
কামরুল স্যার এসে হাজির।
ক্লাসে তখন জলরং-ফুলদানী আর
ক্যানাফুলের গুচ্ছ আঁকা চলছিল। কামরুল স্যার তাঁর দশাসই
বপু নিয়ে এসে হাজির হলেন
ঠিক আমার পেছনে। কিছুক্ষণ
দেখলেন, তারপর বললেন, 'ফুলদানীর কথা ভুলে যাও, শুধু
ফুল আঁক আগে। ওটাই সুন্দর
বেশী। ফুলদানী তো মরবে না,
ফুল মরে যাবে। কাঁচা ফ্রেশ রং-এর ওয়াশ দাও। একবারে
শেষ করো। বলেই তিনি
দাঁড়িয়ে থেকেই আমার হাতের সেবল
হেয়ার তুলিটি নিয়ে উপুড় হয়ে একটি ফুলের পাপড়ি
সেইভাবে দেখিয়ে দিলেন। অবাক
হয়ে দেখলাম, আঁকা লাল ক্যানাটি
ভেজা ভেজা ঝকঝকে রং-এ টস্টস্ করছে। বললেন, তাজা
ফুল আঁকতে গিয়ে যদি মরা ফুল
হয়ে যায় তো আর লাভ
কি?...
কয়েক মিনিটের ঘটনা কয়েকটি কথার উপদেশ এবং তুলির
মাত্র কয়েকটি ছোঁয়া। কিন্তু তা
জীবনে আমার পাথেয় হয়ে আছে।"
বিদেশ ভ্রমণ
আর্ট ইনস্টিটিউটে চাকরিরত অবস্থায় ১৯৫৭ সালের শেষ
দিকে কামরুল হাসান বার্মা
সফর করেন। ইউনেস্কোর উদ্যোগে
নবশিক্ষিতদের জন্য পুস্তক প্রকাশনার ওপর একটি
আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণের
জন্য তিনি রেঙ্গুন যান। তাঁর
সফরসঙ্গী ছিলেন আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দীন। সফরের
পুরো সময় জুড়ে প্রায় মাসখানেক
দুজন রেঙ্গুনে পুরনো ধাঁচের
একটি হোটেলের একই কামরায় অবস্থান করেন। এই সফর
সম্পর্কে আবদুল্লাহ আল মুতী
শরফুদ্দীনের স্মৃতিচারণ থেকে কিছু
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। পেনগুইন প্রকাশনা সংস্থার
একজন প্রধান কর্মকর্তা ব্রিটিশ
প্রকাশনা বিশেষজ্ঞ জে.ই. মরপারগো
ছিলেন এই সেমিনারের পরিচালক। রচনা, মুদ্রণ,
চিত্রসজ্জা ও প্রকাশনা বিষয়ে অনেক
বিশেষজ্ঞের আলোচনা ছিল এই
সেমিনারের অংশ। এছাড়া ছিল কিছু হাতে-কলমে কাজ।
অংশগ্রহণকারীদের চারটি দলে
ভাগ করা হয়। প্রতিটি দলে ছিল
বিভিন্ন দেশের লোক- তাঁদের কেউ লেখক, কেউ সম্পাদক,
কেউ শিল্পী, কেউ প্রকাশক।
প্রতিটি দল নবশিক্ষিতদের জন্য
একটি করে বই রচনা করে এবং তার জন্য ছবি আঁকা হয়।
সে সব বই বর্মী ভাষায় অনুবাদ
করে গ্রামে গিয়ে নবশিক্ষিতদের
পড়তে দেয়া হয়, তারপর তাদের মতামতের ভিত্তিতে
বইগুলো সংশোধন ও পরিমার্জনা করা
হয়। সেমিনারের শেষ পর্যায়ে
চারটি বই ছেপে বের করা হয়। "কামরুল ভাইয়ের দলে
ছিলেন ভারতীয় লেখিকা মিস
কৃষ্ণ সোবরাতী। তিনি যে বইটি
লেখেন
তার নাম 'দ্য প্রিন্স অব পীস' বা 'শান্তির
রাজকুমার', মহামতি বুদ্ধের জীবন নিয়ে
অতি সুন্দর ছোট ছোট কাব্যময় বাক্যে
লেখা
সে বই। আর তার জন্য অপূর্ব সব ছবি এঁকেছিলেন কামরুল
ভাই। বলা বাহুল্য এই বইটিই
শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়েছিল।
তাঁর আঁকা ছবি সে সময় সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এতে
উৎসাহিত হয়ে তিনি রাতারাতি
বেশ কিছু জলরঙের ছবি একেঁ
ফেলেন এবং রেঙ্গুনে পাকিস্তান দুতাবাসে তাঁর ছবির
একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।
প্রদর্শনীতে দেখতে দেখতে
সবগুলো
ছবি বিক্রি হয়ে যায়।"
এই ভ্রমণ সম্পর্কে কামরুল হাসান একটি রচনায়
লিখেছেন, " সেমিনারের বিষয়বস্তু ছিল
অল্প শিক্ষিতদের উপযোগী পুস্তক
লেখন, চিত্রণ এবং প্রকাশনের উপর গবেষণামূলক
আলোচনা। গ্রামে গ্রামেও ঘুরতে
হয়েছিল। এমনি একটি কৃষকের বাড়ীতে
দেখলাম 'ইনসাইক্লোপেডিয়া' রয়েছে সম্পূর্ণ বর্মী
ভাষায়। কৃষকের ছেলেটি তখন অষ্টম
শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন।
মাতৃভাষায় 'ইনসাইক্লোপেডিয়া' হওয়ার সুবিধার্থে
পুত্রের সাথে কৃষক পিতাটিরও পৃথিবী
সম্বন্ধে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন সম্ভব
হয়েছিল।" মাতৃভাষার বিকাশ সাধন যে কতো জরুরি ও
উপকারী সেই উপলব্ধি তাঁর মধ্যে
এ ঘটনায় আরও প্রবল হয়ে
ওঠে।
১৯৭০ সালের এপ্রিল মাসে করম্বো পরিকল্পনার আওতায়
তিনি জাপান সফর করেন। ১৯৭০
সালে বাংলা নববর্ষের
দিনটিতে
তিনি জাপানের উত্তরাঞ্চলে অবস্থান করছিলেন।
১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের একটি সাংস্কৃতিক দল সে
সময়কার সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর
করে। শিল্পী কামরুল হাসান এই
দলের নেতৃত্ব দেন।
১৯৭৫ সালে ওয়ার্ল্ড ক্র্যাফটস কাউন্সিলের সেমিনারে
যোগদান উপলক্ষে বাংলাদেশের
প্রতিনিধি হিসেবে তিনি অস্ট্রেলিয়া
সফর করেন।
১৯৭৭ সালে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন-এর
বেল্লা সেন্টারে অনুষ্ঠিত হস্তশিল্প
মেলা (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) উপলক্ষে
শিল্পী কামরুল হাসান সেখানে যান।
১৯৭৯ সালের ১ মার্চ তিনি আবার লন্ডনে যান। এ
যাত্রায় দেড় মাসেরও অধিককাল
তিনি লন্ডনে অবস্থান করেন।
১৯৮০ সালে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হিসেবে
তিনি পুনরায় লন্ডন সফর করেন।
১৯৮০ সালের আগস্ট মাসে আন্তর্জাতিক কার্পেট মেলায়
যোগদান উপলক্ষে তিনি মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন।
নিউইয়র্কের মডার্ণ আর্ট মিউজিয়াম তাদের পঁচাত্তরতম
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ৩০
আগস্ট ১৯৮০ থেকে পিকাসোর এক
গুরুত্বপূর্ণ শিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করে। কিন্তু এই
প্রদর্শনীর সব টিকেট দ্রুত বিক্রি
হয়ে যাওয়ায় শিল্পী কামরুল হাসানের
পক্ষে এই প্রদর্শনী দেখার আশা ক্ষীণ হয়ে পড়ে।
আগস্টের শেষ দিকে ওয়াশিংটনে নুরুল
ইসলাম অনুর বাসায় তিনি বলেই
ফেলেন, "পিকাসো আমার গুরু। তারই এগজিবিশন হচ্ছে
নিউইয়র্কে। অথচ তা আমার দেখা
হচ্ছে না। এ যে কতবড়ো
দুঃখের
কথা তোমাদের কি বলবো।"
১৯৮২ সালে তিনি কলকাতা যান এবং তিনমাস সেখানে
অবস্থান করেন। কলকাতা যদিও
তাঁর জন্মস্থান, কিন্তু ১৯৪৭-এর
পর
থেকে কলকাতা এ দেশবাসীর কাছে বিদেশ।
সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন
ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে দেশে যখন পাকিস্তানের
সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে
ছাত্র-জনতার সংগ্রাম চলছে তখন
প্রগতিশীল ছাত্র ও সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে কামরুল
হাসানের পরিচয় ঘটে যা ক্রমশ
ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হয়। এই পরিচয় ও
ঘনিষ্টতা আমৃত্যু অক্ষুন্ন ছিল। প্রথম আলো-এর সম্পাদক
মতিউর রহমান (জ. ১৯৪৬)
লিখেছেন, "সে সময়ে বাংলাদেশ
ছাত্র ইউনিয়ন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদের
কর্মী আমরা। গোপনে কমিউনিস্ট
পার্টি করি। সে খবরও তাঁর অজানা
ছিল না।... সে সময়ের দিনগুলোতে যে ধরনের ছোট ছোট
কাজ নিয়ে গেছি, তিনি কোনো
আপত্তি ওজর না তুলে সেগুলো
করে দিয়েছিলেন। সংস্কৃতি সংসদের অনুষ্ঠানগুলোর সঙ্গে
অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল সে
কাজগুলো। রবীন্দ্র বা নজরুলের
জন্মবার্ষিকী, নববর্ষের অনুষ্ঠানের কার্ড তিনি করে
দিয়েছেন। ১৯৬৭ সালের ২১
ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে প্রকাশিত তৎকালীন পূর্ব
পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সংকলন সূর্যজ্বলার জন্য
কামরুল হাসান 'একুশের বিহঙ্গ'
শিরোনামে একটি সুন্দর ড্রইং
দিয়েছিলেন, যা আমরা হলুদ রং-এর ওপর লালে
ছেপেছিলাম।"
১৯৬৮ সাল থেকে দেখা যাচ্ছে, তিনি ক্রমশ রাজনৈতিক
আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে
যুক্ত হচ্ছেন। দেশের কথা চিন্তা
করা,
রাজনীতির জন্য সময় দেয়া- এসব ব্যাপারে ক্রমেই ব্যস্ত
হয়ে পড়েন। অফিস থেকে
ফেরার পর বাকি সময়টা তিনি এ
কাজেই ব্যয় করতেন।
১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে কামরুল হাসান
'বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ'-এর সদস্য
হিসেবে এই আন্দোলনে
সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। শহীদ মিনারে প্রতিদিন
নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে এবং
চলমান ট্রাকে বসেছে গণসংগীতের আসর।
সিনেমা-শিল্পী হাসান ইমাম, গোলাম মোস্তফা,
সংগীতশিল্পী কলিম শরাফী, লায়লা
আরজুমান্দ বানু প্রতিরোধ সংগ্রামে
অংশ
নেন।
১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানের সাজসজ্জা কেমন
হবে তা নিয়ে তাঁর নিজস্ব
পরিকল্পনা ছিল। একুশের অনুষ্ঠানটি
যাতে সুন্দরভাবে পালিত হয় সেইভাবেই তিনি সবকিছুর
আয়োজন করেন। ১৯৬৯ সালের
ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমীর
বটবৃক্ষে অক্ষরবৃক্ষের প্রথম উদ্বোধন করেন তিনি।
মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, "১৯৬৯
সালে 'অক্ষয় বৃক্ষ', বাংলার পট বা
নববর্ষ উৎসবকে জনপ্রিয় করে তোলার ব্যাপারে তাঁর
অবদান অনেক।" শিল্পী কাইয়ুম
চৌধুরী বলেছেন, "আন্দোলনের
পরবর্তী ধাপে কামরুল হাসান তৈরি করেছেন প্রতীক
হিসেবে অক্ষরবৃক্ষ। সমগ্র
বাংলাদেশে এই অক্ষরবৃক্ষকে রোপণ করতে
হবে যাতে একদিন এই বৃক্ষ মহীরুহে পরিণত হয়।...
বাংলা হরফ দিয়ে শাড়ীর নকশা
ঊনসত্তরে অসাধারণ জনপ্রিয়তা
অর্জন
করেছিল।
ঢাকা শহরে বৈশাখী মেলা আয়োজনেরও অন্যতম উদ্যোক্তা
ছিলেন কামরুল হাসান। বাংলার
প্রত্যন্ত অঞ্চলের কারুশিল্পীরা
তাদের সৃষ্টির সম্ভার নিয়ে রাজধানী ঢাকায় পয়লা
বৈশাখে মিলিত হন। নাগরিক
জীবনে এ মেলার আকর্ষণ অবর্ণনীয়। সমগ্র
বাংলাদেশের জীবন যেন এখানে প্রাণ পায়।
বাঙালিত্বের চেতনা প্রসারের লক্ষ্যেই
কামরুল হাসান ঢাকায় বৈশাখী মেলা
অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেন।
১৯৬৯-৭০ সালে কামরুল হাসান নিজ উদ্যোগে প্রচুর
পোস্টার আঁকেন। জাতীয়তাবাদী
চেতনায় ভরা এসব পোস্টারের
একটাতে ছিল ক খ গ ঘ অক্ষর- তার সঙ্গে লেখা ছিল
'একটি অক্ষর, একটি বাঙালির
জীবন।' ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা
তাঁর বাসায় যেত। কামরুল হাসান তাদের হাতে আঠা ও
পোস্টার দিয়ে দিতেন। ওরা
রাতের অন্ধকারে গোপনে বাসের গায়ে
এসব পোস্টার লাগিয়ে দিত। এসব পোস্টার তিনি আঁকেন
সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে এবং
নিজের খরচে- কারো প্রেরণা বা
অনুরোধে নয়। ১৯৭০ সালে তাঁর জীবনের
দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা (জাপান ভ্রমণ ও উপদ্রুত অঞ্চলে
মানবতার সেবায় অংশগ্রহণ)
রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর সম্পৃক্তির প্রমাণ
পাওয়া যায়।
মানবতার সেবা
১৯৭০ সালের নভেম্বরে সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল
ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলে শিল্পী কামরুল
হাসানও অসহায় মানুষদের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। সচেতন
শিল্পী ও দায়িত্বশীল নাগিরক
হিসেবে তিনি উপদ্রুত এলাকায় এক
সপ্তাহ যাবৎ ত্রাণকার্য পরিচালনা করেন। এ ব্যাপারে
ওয়াহিদুল হক প্রদত্ত তথ্যটি
গুরুত্বপূর্ণ। তিনি লিখেছেন, "সত্তরের
নভেম্বরে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকায় প্রাণ
হারালো নিযুত মানুষ।
পাকিস্তানী সরকারের, পাকিস্তানের তথ্য
মূলত:
পাঞ্জাবের অগ্রসর সকল মানুষের এই ব্যাপারে সহানুভূতির
নিদারুণ অভাব কামরুল
হাসানকে তাঁর আমলা হিসেবে বাঞ্ছিত
সকল সাবধানতার বাইরে ঠেলে দেয়। প্রায় একা হাতে,
একারই তাগিতে, হাজার হাজার
পোস্টার এঁকে ঢাকার প্রতি প্রশস্ত
দেয়ালে টানান তিনি। মূল ধুয়া তার : পোড়া মাটি
জোড়া লাগে না।"
১৯৭১ সালের শুরু থেকেই রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের
সঙ্গে তিনি একান্তভাবে
ঘনিষ্ঠ, পুরোপুরিভাবে সক্রিয়। ১৯৭১
সালের ২১ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠান ও সাজসজ্জা নিয়ে
ব্যাপকাকারের পরিকল্পনা করেছিলেন
তিনি। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ
থেকে
অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে তিনি এই আন্দোলনের সঙ্গে
একাত্ম হয়ে পড়েন। অসহযোগ
আন্দোলনের সময় তিনি অফিসে
যেতেন না। বাসা থেকে বের হতেন ঠিকই কিন্তু অফিসে
না গিয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে
মিলিত হয়ে রাজনৈতিক আন্দোলন ও
তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতেন। বন্ধুদের মধ্যে
থাকতেন- আবদুল গণি হাজারী,
সরদার জয়েনউদ্দীন, হাবীবুর
রহমান প্রমুখ।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমানের সেই
ঐতিহাসিক ভাষণের পর সর্বত্র
প্রতিরোধ
কমিটি গঠিত হয়। ঢাকায় হাতিরপুল এলাকার
অধিবাসীদের অনুরোধে শিল্পী কামরুল
হাসান ওই এলাকায় প্রতিরোধ
কমিটির
চেয়ারম্যান হন।
১৯৭১ সালে ইয়াহিয়ার দানবমূর্তি সম্বলিত পোস্টার এঁকে
কামরুল হাসান বিশেষভাবে
খ্যাতি অর্জন করেন। এক সাক্ষাৎকারে
তিনি জানিয়েছেন, ১৯৭০ সালের দিকে ঢাকা যাদুঘরের
কোনো এক অনুষ্ঠানে তিনি প্রথম
ইয়াহিয়া খানকে সামনাসামনি
দেখেন। প্রথম দেখাতেই ইয়াহিয়াকে তাঁর কাছে
ডেভিলের মতো মনে হয়। ১৯৭১ সালের
মার্চ মাসেই পোস্টারের জন্য তিনি
ইয়াহিয়ার অনেকগুলো স্কেচ করেন।
প্রবাসী সরকারের তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের অধীনে
গড়ে ওঠে 'আর্ট ও ডিজাইন
বিভাগ'। শিল্পী কামরুল হাসানকে এই
বিভাগের পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই বিভাগের
অফিস ছিল কলকাতার সার্কুলার
রোডে। এখানে কামরুল হাসানের
নেতৃত্বে কাজ করেন শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, নিতুন
কুণ্ডু, প্রাণেশ মুণ্ডল, জহির
আহমদ, হাসান প্রমুখ। এই শিল্পীরা
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে রচনা করেন একাধিক পোস্টার। এসব
পোস্টারের মাধ্যমে পাকবাহিনীর
গণহত্যার বিরুদ্ধে যেমন তীব্র ধিক্কার
ও প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়, তেমনি মুক্তিযোদ্ধাদের মনে
দেশমাতৃকার জন্য যুদ্ধের উৎসাহ ও
উদ্দীপনাও সৃষ্টি হয়।
এসব পোস্টারের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ-কামরুল হাসানের
আঁকা ইয়াহিয়ার দানবমূর্তি বিষয়ক
কার্টুন সম্বলিত পোস্টারটি। পোস্টারটির ভাষা ছিল
এইরূপ : (বাংলায়) এই জানোয়ারদের
হত্যা করতে হবে এবং (ইংরেজিতে)
Annihilate the
demons। সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এই
পোস্টারটি যেন সম্পৃক্ত হয়ে আছে। ফয়েজ
আহমদ ১৯৭১-
এর ২৩
মার্চ ইয়াহিয়ার কার্টুন-সম্বলিত পোস্টার কেন্দ্রীয়
শহীদ মিনারের দেয়ালে টানানোর
তথ্য উল্লেখ করে বলেছেন, "পরবর্তীকালে
মুক্তিযুদ্ধের সময় মে মাসে শিল্পী মুজিবনগরে ক্যাপশনসহ
প্রথমে দু'রঙে এই কার্টুনটি
চূড়ান্তভাবে অঙ্কন করেন। তাঁর এই পূর্ণ
পৃষ্ঠাব্যাপী কার্টুন মুজিবনগর সরকার একরঙে লক্ষাধিক
কপি পোস্টার হিসেবে ছাপিয়ে
মুক্ত অঞ্চলে বিলি করেছিলেন। এই
কার্টুন সেদিন হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের বলিষ্ঠ ও
শাণিত হাতিয়ার।"
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার
বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য
দিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়
নিশ্চিত হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে কামরুল হাসান ঢাকা
ফিরে আসেন।
পঁচাত্তর-পরবর্তী ভূমিকা
পঁচাত্তর-পরবর্তীকালে স্বাধীনতার শত্রুরা ক্রমশ
সমাজে-রাষ্ট্রে-রাজনীতিতে সর্বত্র
তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে থাকে।
মুক্তিযুদ্ধবিরোধী আদর্শও ক্রমশ প্রসার লাভ করে। এই
পরিস্থিতি কামরুল হাসানকে
স্বস্তি দিত না।
কামরুল হাসান কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না
ঠিকই, কিন্তু জাতীয়তাবাদী
চেতনার ধারক ছিলেন, ছিলেন
দেশাত্মবোধে পুরোপুরিভাবে উদ্বুদ্ধ। এ কারণে প্রগতিশীল
সকল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে
তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। সকল
প্রকার ধর্মন্ধতা, কূপমণ্ডকতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে
মুক্তবুদ্ধি ও গণতন্ত্রের পক্ষে
তিনি সোচ্চার ছিলেন। স্বৈরতন্ত্র ও
সামরিকতন্ত্রেরও ঘোর বিরোধী ছিলেন তিনি।
মানবকল্যাণই ছিল তাঁর আদর্শ।
শিল্পী কামরুল হাসানের বাড়িতে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী
গোষ্ঠীর আক্রমণের বিবরণ
দিতে গিয়ে তাহমিনা মুক্তাদির
লিখেছেন, "১৯৮২ সালে তাঁর একটি বক্তৃতাকে কেন্দ্র
করে মৌলবাদী কিছু ব্যক্তি তাঁর
রাজাবাজারের স্টুডিওতে আক্রমণ
করে
এবং বড়ো একটি ক্যানভাস ছিড়ে ফেলে। সেই ক্যানভাসে
তালি দিয়ে রাগে ক্ষোভে লাল
বাদামী এবং কালো রঙে তিনি
লণ্ডভণ্ড ধ্বংসযজ্ঞের একটি ছবি এঁকেছিলেন।"
প্রতিক্রিয়াশীল মহল কিংবা স্বৈরাচারী শাসকচক্র যে
পক্ষ থেকেই আক্রমণ আসুক না কেন
কামরুল হাসানের সাহসী অগ্রযাত্রা
থেমে থাকেনি। তাঁর প্রতিবাদ, তাঁর মুক্তবুদ্ধির প্রকাশ
অপ্রতিহত গতিতে অগ্রসর
হয়েছে। 'একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে
কোথায়' এই নামে একটি বই বের হয় ১৯৮৬ সালের
ফেব্রুয়ারি মাসে। কামরুল হাসান এর
প্রচ্ছদ এঁকে দেন। 'মুক্তিযুদ্ধ
চেতনা বিকাশ কেন্দ্র' ছিল বইটির প্রকাশক। বইয়ের
প্রিন্টার্স লাইনে প্রচ্ছদ শিল্পী
হিসেবে কামরুল হাসানের নামই শুধু ছাপা
হয়। বইয়ের লেখক বা প্রকাশক কারো নামই ছাপা
হয়নি।১৯৮৭ সালের এপ্রিল মাসে
তিনি শান্তির পক্ষে একটি পোস্টার
আঁকেন। বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টি পোস্টারটি প্রচার
করে। পোস্টারটির স্লোগান
ছিল 'সুনীল পৃথিবীতে বন্ধ হোক যুদ্ধের
সকল আয়োজন'। নীলের ওপর সাদা অক্ষর, দুটো পাখি
উড়ছে।
১৯৮৭ সালে এরশাদের সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে
দেশের প্রথম সারির একত্রিশজন
বুদ্ধিজীবীর বিবৃতি দেশের রাজনৈতিক
আন্দোলনে এক বিরাট অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে। এই
একত্রিশজনের মধ্যে শিল্পী কামরুল
হাসানও ছিলেন।
জীবনে সর্বশেষ যে প্রচ্ছদটি তিনি আঁকেন সেটি
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি বইয়ের।
স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের বিরুদ্ধে আমৃত্যু সংগ্রামের
পাশাপাশি সামরিক স্বৈরাচারের
বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন সমানভাবে
সোচ্চার। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেও তিনি এঁকেছেন
'বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে বাংলাদেশ' শীর্ষক
কার্টুন চিত্র। এর মধ্য দিয়ে যেমন তিনি
স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে চরম ঘৃণা ব্যক্ত করেছেন তেমনি
কামনা করেছেন তার সমূলে
বিনাশ।
পদক-পুরস্কার ও স্বীকৃতি
১৯৬৫ সালে কামরুল হাসান প্রেসিডেন্ট পুরস্কার
(তমঘা-ই-পাকিস্তান) লাভ করেন।
পুরস্কারের মূল্যমান ছিল দশ হাজার
রুপি। কামরুল হাসান আইয়ুবের সামরিক শাসনের ঘোরতর
বিরোধী ছিলেন। তবু তিনি এই
পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেননি।
এই পুরস্কার প্রাপ্তিকে তিনি বিজয় হিসেবে
নিয়েছিলেন। তাঁর বিরোধিতা সত্ত্বেও
তাঁকে যে পুরস্কার দেওয়া হলো- সেটা তাঁকে
কেনার জন্য, তা তিনি মনে করতেন না। বরং তাঁকে বাদ
দেওয়া যে কোনোভাবে সম্ভব
হয়নি, পুরস্কার প্রদানের ঘটনাটিকে
তিনি সেভাবেই মূল্যায়ন করেছেন।
ষাটের দশকের শেষার্ধে শিল্পী কামরুল হাসান
মৌলভীবাজারে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে
যোগ দেন। মৌলভীবাজার কলেজে
এই
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সৈয়দ মুস্তফা আলী
সভায় সভাপতিত্ব করেন। ঢাকা
থেকে গিয়েছিলেন কবি সুফিয়া
কামাল (জ. ১৯১১), সরদার জয়েনউদ্দীন, ড. এনামুল হক
(জ. ১৯৩৭) প্রমুখ। কামরুল
হাসানের সঙ্গী হিসেবে গিয়েছিলেন
শিল্পী হাশেম খান (জ. ১৯৪১), শিল্পী রফিকুন নবী,
সাংবাদিক শাহাদাত চৌধুরী
প্রমুখ।
এ সময়কালে তিনি যেসব গ্রন্থের প্রচ্ছদ আঁকেন, তার
মধ্যে দুটি বিশেষভাবে
উল্লেখযোগ্য। একটি, সানাউল হকের বন্দর
থেকে বন্দরে (১৯৬৪); আরেকটি, সিকানদার আবু জাফর
অনূদিত রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম
(১৯৬৬)। প্রথমোক্তটির জন্য
তিনি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন।
১৯৭৭ সালে কুমিল্লা ফাউন্ডেশন শিল্পী কামরুল হাসানকে
তাঁর শিল্পকর্মের জন্য
স্বর্ণপদক প্রদান করে। পদক দেওয়া হয়
২৯
ডিসেম্বর তারিখে। তিনি আমন্ত্রিত হয়ে পদক গ্রহণের
জন্য ওইদিন কুমিল্লা যান।
ঢাকার মতিঝিল থেকে সকাল ৯টা ১০
মিনিটে
গাড়ি ছেড়ে ধীরগতিতে গিয়ে কুমিল্লা সার্কিট হাউসে
পৌঁছান দুপুর বারোটায়। পথে
বারকাত্তায় খাদি ছাপার কারখানা পরিদর্শন
করেন। পদকপ্রাপ্তি সম্পর্কে ওইদিনের খেরোখাতায়
কামরুল হাসান লিখেছেন, "কুমিল্লায়
পৌঁছে জানতে পারলাম জাতীয়
পর্যায়ে যিনি যে বিষয়ে অবদান রেখেছেন এবং
কুমিল্লার যারা কৃতি সন্তান তাঁদেরকেও
স্বর্ণপদকে ভূষিত করা হবে। উদ্দেশ্য
খুবই মহৎ। সমবায়ের ক্ষেত্রে কুমিল্লা এরই মধ্যে অবদান
রেখেছে। সেক্ষেত্রে যাঁরা
সফলতা এনেছেন তাঁদেরকেও এই সম্মান
প্রদান করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কুমিল্লা সমবায়ের
একজন ড্রাইভারকেও আমাদের মতো
সম্মান দেওয়া হয়েছে। আমাদের
সাথে একজন ড্রাইভারকেও তাঁর ক্ষেত্রে সফলতার জন্য
পুরস্কৃত করায় আমি ব্যক্তিগতভাবে
খুবই আনন্দিত। এই ব্যাপারে,
আমি আশার আলো দেখতে পাচ্ছি।"
১৯৭৯ সালে তিনি লাভ করেন 'স্বাধীনতা দিবস
পুরস্কার'। তখন জিয়াউর রহমানের
(১৯৩৬-৮১) শাসনামল। জিয়াউর
রহমান কৈশোরকালে মুকুল ফৌজের সদস্য ছিলেন। সে
কারণে কামরুল হাসানের প্রতি তাঁর
শ্রদ্ধা ছিল। জিয়াউর রহমান
কামরুল হাসানকে আলাদাভাবে একটি গ্যালারি করে
দেওয়ার ব্যাপারে কথা দিয়েছিলেন
এবং সে অনুযায়ী একটি লে-আউট
করার জন্যও বলেছিলেন। কামরুল হাসান লে-আউট করে
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমাও
দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশাসনের
আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তা আর ফলপ্রসূ হতে
পারেনি।
১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদের
উপদেষ্টা কমিটির এক নম্বর
সদস্য ছিলেন তিনি। এ বছরই কামরুল
হাসান 'বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মান' লাভ
করেন। ১৯৮৫ সালে কামরুল হাসান
কাজী মাহবুবউল্লাহ ফাউন্ডেশন
পুরস্কার লাভ করেন। ওই বছরই তাঁর বিখ্যাত তৈলচিত্র
'তিনকন্যা' অবলম্বনে একটি
সুদৃশ্য ডাকটিকেট প্রকাশ করে
তৎকালীন যুগোশ্লাভ সরকারের ডাক, তার ও টেলিফোন
বিভাগ (২ ডিসেম্বর ১৯৮৫)।
কোনো বিদেশী সরকার কর্তৃক
বাংলাদেশি কোনো শিল্পীর শিল্পকর্ম সম্বলিত ডাকটিকেট
প্রকাশের ঘটনা এটাই প্রথম।
যুগোশ্লাভিয়ার ডাক বিভাগ একই
সঙ্গে পাঁচটি দেশের পাঁচজন বিশিষ্ট শিল্পীর চিত্রকর্ম
নিয়ে ডাকটিকেট প্রকাশ করে।
কামরুল হাসান ছিলেন এই পাঁচজন
শিল্পীর অন্যতম।
১৯৮৫ সালে তিনি বাংলা একাডেমীর ফেলো মনোনীত হন।
১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ
সরকারের ডাকবিভাগ তৃতীয় দ্বিবার্ষিক
এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী উপলক্ষে কামরুল হাসানের
'নাইওর' চিত্রকর্মটি অবলম্বনে ৫
টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক
ডাকটিকেট প্রকাশ করে।
১৯৮৬ সালে 'আতেলিয়ে'৭১' নামে একটি সংগঠন কামরুল
হাসানকে 'শিল্পাচার্য'
উপাধিতে ভূষিত করলে এ নিয়ে বিতর্ক
সৃষ্টি
হয়। কামরুল হাসান নিজেকে 'পটুয়া' হিসেবে পরিচয়
দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ
করতেন।
সংগ্রহ
জোটনিরপেক্ষ দেশসমূহের জন্য টিটোগ্রাদে স্থাপিত
চিত্রশালা, লন্ডনের কমনওয়েলথ
ইনস্টিটিউট, জাপানের ফূকুওকা মিউজিয়াম,
ঢাকার শিল্পকলা একাডেমী, জাতীয় জাদুঘর এবং পৃথিবীর
বহুদেশের শিল্পরসিকদের
ব্যক্তিগত সংগ্রহে কামরুল হাসানের
চিত্রকলা সংরক্ষিত রয়েছে। সবচেয়ে বেশি সংগ্রহ
রয়েছে ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে। দেড়
হাজার শিল্পকর্ম রয়েছে এখানে।
জীবনের শেষ দিন
১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সকালেই শিল্পী
কামরুল হাসান অতঃপর পৌঁছে যান
কবিতা উৎসব প্রাঙ্গণে। সারাদিন
তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। বিকেলের স্বরচিত
কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে তিনি
সভাপতিত্ব করছিলেন। সভাপতির দায়িত্ব
নিয়ে মঞ্চে ওঠেন বিকেল ৩ টায়। তারপর একনাগাড়ে
সেখানে ছ'ঘন্টা। বসে বসে
কবিতা শুনছিলেন এবং হাতের কাছে যা
পাচ্ছিলেন তাতেই এঁকে যাচ্ছিলেন কিছু একটা। এভাবেই
কবি রবীন্দ্র গোপের ডায়রির
পাতায় আঁকেন সেসময়ে ক্ষমতাসীন
বাংলাদেশের সামরিক স্বৈরাচারকে নিয়ে কার্টুনচিত্র
'দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার
খপ্পরে।' রাত নটার কাছাকাছি সময়ে হৃদরোগের
আক্রমণটি তীব্রভাবে অনুভূত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ
হাসিনার ব্যক্তিগত গাড়িতে করে তাঁকে
নিয়ে যাওয়া হয় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। রাত তখন
৯টা ২০ মিনিট। সেখানে রাত
৯টা ৩৫ মিনিটে তিনি মৃত্যুবরণ
করেন।
স্থপতি রবিউল হুসাইন একে 'একটি ঈর্ষাজাগানিয়া মৃত্যু'
বলে অভিহিত করেছেন। রবিউল
হুসাইন উদ্ধৃত করেছেন রবীন্দ্র
সংগীতাশিল্পী কলিম শরাফীর বক্তব্য : "যদি এমন মৃত্যুর
নিশ্চয়তা পাই তবে আমি মরতে
রাজি।"
৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮ বুধবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মসজিদ চত্বরে বিদ্রোহী কবি
কাজী নজরুল ইসলাম ও শিল্পাচার্য
জয়নুল আবেদিনের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
তথ্য ও ছবি সূত্র - কামরুল হাসান; জীবন ও কর্ম,
লেখক- সৈয়দ আজিজুল হক। বাংলা
একাডেমি ঢাকা কর্তৃক
প্রকাশিত। প্রকাশ কাল - ১৯৯৮, জুন।