<bgsound src="flash/guni.wav">
 
Links
 
এ পর্যন্ত পড়েছেন
জন পাঠক
 
 
সর্বমোট জীবনী 323 টি
ক্ষেত্রসমূহ
সাহিত্য ( 37 )
শিল্পকলা ( 18 )
সমাজবিজ্ঞান ( 8 )
দর্শন ( 2 )
শিক্ষা ( 17 )
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ( 8 )
সংগীত ( 10 )
পারফর্মিং আর্ট ( 13 )
প্রকৃতি ও পরিবেশ ( 2 )
গণমাধ্যম ( 8 )
মুক্তিসংগ্রাম ( 156 )
চিকিৎসা বিজ্ঞান ( 3 )
ইতিহাস গবেষণা ( 1 )
স্থাপত্য ( 1 )
সংগঠক ( 8 )
ক্রীড়া ( 6 )
মানবাধিকার ( 2 )
লোকসংস্কৃতি ( 1 )
নারী অধিকার আন্দোলন ( 2 )
আদিবাসী অধিকার আন্দোলন ( 1 )
যন্ত্র সংগীত ( 0 )
উচ্চাঙ্গ সংগীত ( 1 )
আইন ( 1 )
আলোকচিত্র ( 3 )
সাহিত্য গবেষণা ( 0 )
ট্রাস্টি বোর্ড ( 12 )
নেত্রকোণার গুণীজন
উপদেষ্টা পরিষদ
গুণীজন ট্রাষ্ট-এর ইতিহাস
"গুণীজন"- এর পেছনে যাঁরা
Online Exhibition
 
 

GUNIJAN-The Eminent
 
গোলাম মুস্তাফা
 
 গোলাম মুস্তাফা
trans
‘‘ষাটের দশকের মাঝামাঝি কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময়ই ঢাকা রেডিওতে অভিনয় শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হই। তখন চলচ্চিত্রের নায়ক, নায়িকা, পরিচালক- সবাই রেডিওতে অভিনয় করতেন। সম্মানী তাদের কাছে নামমাত্র। প্রথমেই সুযোগ এলো গোলাম মুস্তাফার সাথে অভিনয়ের। প্রচন্ড উত্তেজনা। অভিনয়ের অভিজ্ঞতা আমার স্কুল- কলেজের বার্ষিক নাটকের আর লুকিয়েচুরিয়ে আবৃত্তি করার। সেই প্রবল উত্তেজনার সাফল্যের ব্যাধি দাঁতের ব্যথা শুরু হয়ে গেল। সামনে হাতেলেখা অস্পষ্ট কার্বনের পাণ্ডুলিপি আর গালে হাত। মহড়া কক্ষ বোঝাই তৎকালীন তারাকারা। চোখ তুলে তাকাই না। শ্রদ্ধা-ভয় দাঁতের ব্যথা মিলিয়ে এক মহা অস্বস্তিকর অবস্থা। গোলাম মুস্তাফা আমার দিকে তাকালেন বড় বড় চোখে!

আপনার কী হয়েছে?

প্রাণপণে লুকোবার চেষ্টা করি নিজেকে।

মাথা ব্যথা? খুবই সঙ্কোচের সাথে বলি-

জি না, দাঁতে ব্যথা।

ওষুধ খেয়েছেন?

জি না।

আরে দাঁতে ব্যথা, সে তো, মারাত্মক ব্যাপার। দুটো নোভালজিন খেয়ে নিন। বলেই পিয়ন ডাকলেন। টাকা দিয়ে ওষুধ আনলেন। পানি দিতে বললেন। ওষুধ খাওয়ালেন। তারপর সবাই মিলে চা খাওয়ার সময় আমাকেই গরম চাটা সবার আগে দিতে বললেন। দ্রুত আমার দাঁতের ব্যথা নিরাময় হয়ে গেল। সেই সাথে ভয় ভীতিও কাটতে লাগল। এই ঘটনার আগে তারকাদের আমি অতিমানব হিসেবে ভাবতাম। তাদের অনুভূতি, মানুষের সাথে সম্পর্ক- এ সবই মনে হতো এক অলৌকিক বিষয়। তাঁরা যেহেতু সাধারণ নন তাই জীবনের সাধারণ তুচ্ছ ব্যাপারগুলো নিয়ে তাঁদের মাথা ব্যথা নেই। জীবনের একেবারে প্রারম্ভেই গোলাম মুস্তাফা সেসব ভেঙ্গে চুরমার করে দিলেন। সারা পাকিস্তানের অসাধারণ খ্যাতিমান তারকা মুস্তাফার ভিতর থেকে এক অতি সাধারণ সরল সংবেদনশীল মানুষটি বেরিয়ে এলেন। এক ভালো মানুষকে আবিষ্কার করলাম।’’

বাংলাদেশের অন্যতম ও শক্তিমান অভিনেতা, আবৃত্তিকার গোলাম মুস্তাফা সম্পর্কে বাংলাদেশের সংস্কৃতিজগতের আরেক দিকপাল মামুনুর রশীদ উপরের কথাগুলি বলেছেন।

১৯৩৫ সালের ২ মার্চ পিরোজপুর শহরে গোলাম মুস্তাফা জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম মৌলভী মোহাম্মদ ইসমাইল। পৈত্রিক বাড়ি দপদপিয়া, নলচিঠি, ঝালকাঠি। ৪ ভাই ১ বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। বাবা মারা যান ১৯৪৪ সালে। পরিবারের সঙ্গ পেয়েছেন খুবই কম। বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের সবাই বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েন। খুলনার ১৫ সারদা বাবু রোডের লাল ইটের ছোট্ট ঘরে ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত মাত্র দুবছরের মতো সময় পাঁচ ভাই বোন ও মা মিলে বসবাস করেন। মা মারা যান ১৯৫৩ সালে।

পিরোজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে গোলাম মুস্তাফা সরাসরি চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হন। মেট্রিক পাশ করেন ১৯৫০ সালে, খুলনা জিলা স্কুল থেকে । মেট্রিক পরীক্ষার পর বড় ভাইয়ের চাকরির সুবাদে কিছুদিন পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের লারকানায় থাকেন। সেখান থেকে ফিরে খুলনার দৌলতপুর কলেজে ভর্তি হন এবং এই কলেজ থেকে ১৯৫২ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ১৯৫৫ সালে ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন। পরবর্তীসময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শুরু করেন কিন্তু তা শেষ করেননি।

তাঁর মেজ ভাই প্রয়াত শামছুল হুদা অভিনয় ও আবৃত্তি করতেন। ছেলেবেলায় তাঁর কাছ থেকে তিনি অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। বাড়ির অন্য সদস্যদের মধ্যে মোটামুটি সবাই গান বাজনা জানতেন। শুধু গোলাম মুস্তাফা এসব কিছু পারতেন না, আর সেকারণে তিনি আবৃতির দিকে ঝুঁকে পড়েন। সেসময় রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কন্ঠে মহালয়া শুনতেন। খুব ভাল লাগত তাঁর। অর্থ না বুঝলেও সুর করে পাঠের মধ্যে কন্ঠের এমন কারুকাজ থাকতো যার ফলে তিনি এই শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হন। সে সময় কলকাতা রেডিওতে জয়ন্ত চৌধুরী, বসন্ত চৌধুরীদের কন্ঠে কবিতা শুনতেন। এসব শুনে শুনে এ শিল্পের প্রতি ভালবাসা জন্ম নেয় তাঁর। ১৯৪৫ সালে বরিশাল জিলা স্কুলে ফাতেহা-ইয়াজ দাহম উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে তিনি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ফাতেহা-ইয়াজ দাহম’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন। আর এটিই তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক কবিতা আবৃত্তি। তিনি তখন ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। পরবর্তীতে ১৯৪৯, ১৯৫০ সালের দিকে খুলনায় যান তিনি। সেখানে গিয়ে ‘সাহিত্য শিল্প সংকেত’ গোষ্ঠির কর্মীদের সাথে পরিচয় হয় তাঁর। তখন তিনি মেট্রিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আর এসময় তিনি কবিতাকে নতুনভাবে আবিস্কার করলেন। কবিতাকে প্রতিবাদের প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করলেন তিনি । সেসময় ‘সাহিত্য শিল্প সংকেত’ থেকে বামপন্থী ঘেঁসা প্রগতিশীল কর্মীরা বেরিয়ে আসেন এবং ‘অগ্রণী শিল্পী সংঘ’ গড়ে তোলেন। তখন কবিতার মাধ্যমে কে এম হাসান, আনোয়ারুল হক, জাহান আলী এদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়তে থাকে তাঁর। ১৯৫০ সালের দিকে বাম আন্দোলনে কবিতা আবৃত্তির একটা বড় ভূমিকা ছিল। তখন থেকেই রাস্তায় রাস্তায়, মিটিং-এ মিছিলে পড়া শুরু হলো সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, কবি সমর সেনের কবিতা । এসবই কৈশেরোত্তীর্ণ যুবককে অনুপ্রাণিত করল। পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি সময়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে আয়োজিত বাৎসরিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় আবৃত্তি পরিবেশন করেন তিনি। এটিই হলো ঢাকায় প্রথম আবৃত্তি তাঁর। বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত আবৃত্তির বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়ও তিনি অংশ নেন এবং পুরস্কার লাভ করেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১২৫তম জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে লন্ডন ট্যাগোরিয়ানস এর আমন্ত্রণে লন্ডনে যান গোলাম মুস্তাফা এবং আবৃত্তি পরিবেশন করেন। অন্নদাশঙ্কর রায়ের সভাপতিত্বে সংগঠিত ১৪০০ সাল উদযাপন কমিটির আমন্ত্রণে এবং একই সময় আয়োজিত বাংলাদেশ বই মেলায় বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক দলের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে ভারতের কলকাতায় আবৃত্তি পরিবেশন করেন তিনি। আবৃত্তির মধ্য দিয়ে ষাট দশক থেকে দেশের বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন তিনি। নবীন ও তরুণদের কাছে প্রেরণার উৎস ছিলেন তিনি। যেকোন আন্দোলনের সময় শহীদ মিনারে এসে তিনি ‘বাংলা ছাড়ো’ কবিতাটি আবৃত্তি করেছেন। তাঁর কন্ঠে সিকান্দার আবু জাফরের ‘বাংলা ছাড়ো’ কবিতাটির আবৃত্তিতে ছিলো বিউগলের আহ্বান। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জান নূরের মতে, ‘তাঁর মতো কেউ ‘বাংলা ছাড়ো’ কবিতাটি পড়তে পারে বলে আমার জানা নেই।’ সেসময় রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়া ও কবিতা পড়া ছিল একটা লড়াই। সুযোগ পেলেই গোলাম মুস্তাফা রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়তেন। তিনি তাঁর মতো করে লড়াই করে গেছেন। একথা নি:সন্দেহে বলা যায় উভয় বাংলার প্রধান আবৃতিকার গোলাম মুস্তাফা। আজীবন তিনি আবৃতি করেছেন ভালোবাসার জন্য। তিনি প্রায় অর্ধশতক ধরে নিরলসভাবে আবৃত্তি চর্চা করেছেন। তাঁর স্মৃতিশক্তির প্রখরতার বিষয়টি ছিল সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার । বই সামনে না রেখে কত দীর্ঘকবিতা অনর্গল স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করে গেছেন। আজীবন এদেশের প্রতিটি সৎ ও নিষ্ঠাবান আবৃত্তিকর্মী গোলাম মুস্তাফার নাম ভালবেসে উচ্চারণ করবে। আমন্ত্রিত প্রশিক্ষক হিসেবে বিভিন্ন সংগঠন কর্তৃক আয়োজিত আবৃত্তি কর্মশালায় আবৃত্তির প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি । গোলাম মুস্তাফা বিভিন্ন আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবেও দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের অভিভাবক ছিলেন তিনি।

আবৃত্তির ৪টি অডিও ক্যাসেট প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। প্রাঙ্গণে মোর: এক, এতে আছে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, প্রাঙ্গণে মোর: দুই, এতে সংকলিত হয়েছে বাংলাদেশ, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কবিতা। ১৯৯১ সালে এই ক্যাসেট দু’টি প্রকাশিত হয় । প্রযোজনা করেন ক্যামেলিয়া মুস্তাফা। আবৃত্তিশিল্পী শিমুল মুস্তাফার উৎসাহে ১৯৯৫ সালে তাঁর আরো দু’টি অডিও ক্যাসেট প্রকাশিত হয়। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা সংকলিত হয় ‘গাহি সাম্যের গান’ শিরোনামের ক্যাসেটটিতে। ‘উদ্যান ও বিবিধ কুসুম’ ক্যাসেটে নানা ধরনের কবিতার সমাহার ঘটে । মার্স এই দু’টি ক্যাসেট প্রযোজনা করেছে । পরিবেশক বেতার জগত।

গান শোনা, বই পড়া, স্কেচ করা তাঁর শখ। তবে তাঁর অন্যতম শখ হলো আড্ডা দেয়া । ছাত্রজীবন থেকে তিনি অবিরাম আড্ডা দিয়েছেন। তাঁর আড্ডার বিশেষ স্থান ছিলো- বরিশালের রুচিরা রেস্টুরেন্ট এবং কালিবাড়ি পাড়ার অশ্বনী কুমারের বাড়ির সামনের মাঠ, খুলনার মধুদার মিষ্টির দোকান, ঢাকায় জগন্নাথ কলেজের ক্যান্টিন, কসবা রেস্টুরেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন ও এফডিসি ইত্যাদি । নিউ ইস্কাটনের একটি আড্ডায় একটানা ২৪ বছর ধরে তিনি আড্ডা দিয়েছেন। বন্ধুদের কাছে তিনি ছিলেন ‘বয়া’, সমসাময়িকদের কাছে ছিলেন প্রিয় “চাদ” ভাই আর সন্তানদের কাছে ছিলেন প্রিয় “বোবা”।

১৯৫৮ সালে মে অ্যান্ড বেকার নামক ওষুধ কোম্পানিতে চাকরির মাধ্যমে গোলাম মুস্তাফার কর্মজীবন শুরু হয়। এখানে মাত্র ১ বছর চাকরি করেন তিনি। এরপর হরদেও গ্লাস ফ্যাক্টরিতে যোগদান করেন। এখানেও মাত্র কয়েক মাস চাকরি করেন। পরবর্তীতে অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। এই পেশাতেই ছিলেন আজীবন । ১৯৫১/৫২ সালে খুলনাতে থাকার সময় বিশ্ব নাটকের সাথে পরিচয় তাঁর। এসময় বার্নাড শ, টেরেস রেটিগান, টেনেসি উইলিয়াম, জেবি প্রিস্টলি, চেখভ-মলিয়ের-ইবসেন-বেখট-বেকেটসহ বিশ্ব বরেণ্য সব নাট্টকারের নাটক আর অনুবাদ গোগ্রাসে পড়ে ফেলেন। তাই ঢাকায় বাংলাদেশের প্রথম গ্রুপ থিয়েটার “ড্রামা সার্কেল” প্রতিষ্ঠার সাথে সাথেই এর সাথে জড়িয়ে পড়েন । দু একটি নাটকে অভিনয়ও করেন ।

মাত্র ১০ বছর বয়সে ১৯৪৫ সালে বরিশাল অশ্বিনী কুমার হলে বিডি হাবিবুল্লা রচিত ‘পল্লী মঙ্গল’ নাটকে অভিনয় করেন তিনি। আর এই নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর অভিনয় জীবন শুরু হয়। জগন্নাথ কলেজে ১৯৫৫ সালে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পরিনীতা’য় অভিনয় করেন। এছাড়া তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন তখন বিভিন্ন মঞ্চ নাটকে অংশ নেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেন। নাট্যশিল্পী হিসেবে ১৯৫৫ সাল থেকে বেতারে এবং ১৯৬৬ সাল থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে অভিনয় করে আসছেন গোলাম মুস্তাফা । টেলিভিশনে তিনি অনেক স্মরণীয় অভিনয় করেছেন । শেক্সপিয়র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র থেকে শুরু করে হাল আমলের নাট্যকারদের অনেক উল্লেখযোগ্য নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি।

১৯৬০ সাল থেকে তিনি নিয়মিত চলচ্চিত্রে অভিনয় করছেন। ‘রাজধানীর বুকে’ তাঁর অভিনীত প্রথম বাণিজ্যিক ছবি। তবে প্রামাণ্যচিত্র ‘এক বিঘা জমি’র মাধ্যমে ১৯৫৭-৫৮ সালে চলচ্চিত্রে তাঁর আবির্ভাব ঘটেছিল। ওই ছবির মাধ্যমে এ দেশে ইরি ধান চাষ প্রচলনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ছবিটি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার পেয়ে সারা পাকিস্তানের জন্য সম্মান বয়ে এনেছিল।

‘হারানো দিন’ ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। ছবিটি বাংলাদেশসহ সমগ্র পাকিস্তানে অনেক প্রশংসা পায়। ‘হারানো দিন’এর পর ‘চান্দা’ তাঁর আরেকটি মাইল ফলক। ‘হারানো দিন’ ছবিতে গোলাম মুস্তাফা ভিলেনী উপস্থাপনার অদ্ভুত দক্ষতা দেখালেন। যা আর কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না। চরিত্র ও গল্পের ভিতর যুগপৎ ঢুকে যাবার দুর্দান্ত গুণ এবং ক্ষমতা ছিলো তাঁর।

তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হলো- চান্দা, হারানো দিন, নদী ও নারী, চাওয়া পাওয়া, মিশর কুমারী, ধীরে বহে মেঘনা, তিতাস একটি নদীর নাম, পালঙ্ক, চন্দ্রনাথ, সূর্যসংগ্রাম, নাচঘর, বন্ধন, কারওয়, কাজল, বিনিময়, রং বদলায়, গোরী, নতুন দিগন্ত, সোনার খেলনা, আলোর পথে, শ্লোগান, সারেং বউ, কপতী, কুয়াশা, চন্দ্রনাথ, রাজলক্ষী শ্রীকান্ত প্রভৃতি।

‘হারানো দিন’ ছবিতে ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করেও তিনি ছিলেন রাজপুত্র । সেই থেকে শুরু। এরপর কত বিচিত্র ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি তার ইয়ত্তা নেই। আর এভাবেই তিনি হয়ে উঠেন জাত অভিনেতা। তাঁর ভাষাতে বলতে হয়- “ঢাকার ছবিতে ভিলেন চরিত্রের সবচাইতে বড় স্বার্থকতা এই যে, তাঁরা ছবিতে নায়ককে নায়ক করে তোলে। ভিলেন যদি না থাকে তো নায়কের নায়োকোচিত গুণপনা কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না।”

এভাবে তিনি সারাজীবন নায়কদের জিতিয়ে দিয়ে নিজে নীরবে শিল্প সাধানা করে গেছেন, হয়ে উঠেছেন একজন পরিপূর্ণ শুদ্ধ শিল্পী। ‘রাজধানীর বুকে’ ছবিতে নব্য ধনী সম্প্রদায়ের ভিলেন হিসেবে অভিনয় করেন। আর ‘সূর্যগ্রহণ’ ছবিতে শোষক জমিদার সম্প্রদায়ের ভিলেন হিসেবে অভিনয় করেন। আর এভাবেই আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় অঙ্গনের প্রতিক্রিয়াশীলতাকে ভিলেন হিসেবে রূপারোপ করে আমাদেরকে সচকিত করে তুলেছেন। গোলাম মুস্তাফা শুধুমাত্র চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনেই অভিনয় করেননি। অভিনয়ের অন্যান্য শাখায়ও সদর্পে পদচারণা করেছেন। ষাটের দশকের শুরু থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত ঢাকা বেতারের অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। মাঝে মধ্যে মঞ্চেও অভিনয় করেছেন। বিজ্ঞাপন চিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি । অভিনয় সংক্রান্ত যে কোন কাজ, তা যত ক্ষুদ্রই হোক, তিনি অত্যন্ত মনযোগ ও শ্রম দিয়ে করেছেন ।

গোলাম মুস্তাফা অভিনয় ও আবৃত্তির পাশাপাশি লেখালেখিও করেছেন । ইউ.এস.আই.এস থেকে ‘ফেয়ার উইন্ড টু ভার্জিনিয়া’ নামে একটি ইংরেজি বইয়ের বাংলা অনুবাদ করেন তিনি। বইটির রচয়িতা কর্নেলিয়া মেইগ্স। অনুবাদে বইটির নামকরণ করা হয় ‘নতুন যুগের ভোরে’। তাঁর বিশের অধিক সায়েন্স ফিকশনের ভাবানুবাদ ছাপা হয়েছে চিত্রালী, সন্ধানী, ঝিনুক প্রভৃতি পত্রিকায়। এক সময় তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার জন্য চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা করেছেন। রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে সাপ্তাহিক রোববারে তিনি কলাম লিখেছেন।

শিল্পী হিসেবে, নাগরিক হিসেবে অঙ্গীকার পালন করেছেন, কখনো পিছপা হননি। এদেশের এমন কোনো গণআন্দোলন হয়নি, যেখানে গোলাম মুস্তাফা অংশগ্রহণ করেননি। খুলনার দৌলতপুর বি এল কলেজের ভাষা আন্দোলন কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। আর এই কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি ’৫২ এর ভাষা আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেন। তিনি ষাটের দশকের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথেও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। উনসত্তরের গণআন্দোলনে পথনাটক, আবৃত্তির পাশাপাশি মিছিল এবং সভায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ করতেন। গোলাম মুস্তাফা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। উদীচী ও আমরা সূর্যমুখীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। রংপুরের শিখা নাট্যগোষ্ঠী ও নওগাঁর করোনেশন ক্লাবের আজীবন সদস্য ছিলেন। তবে সংগঠন দ্বারা তিনি কখনো তাঁর শিল্পী সত্বাকে অধিকৃত হতে দেননি। সরাসরি মিটিং-মিছিল-বক্তৃতায় অংশগ্রহণ না করে, আবৃত্তি আর অভিনয়ের মাধ্যমেই তিনি প্রতিবাদ করেছেন। ‘৭০ এর ঘূর্ণিঝড়ের পরে রাস্তায় নেমে এসেছেন তিনি। স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুর্গতদের জন্য সাহায্য তুলেছেন।

বাঙ্গালি সংস্কৃতির উপর যখনি আঘাত এসেছে, তখনই তিনি সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন। পাকিস্তানি তমসার কালে ছায়ানট যখন রমনার বটমূলে বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা করে, তখন সহযাত্রী হিসেবে গোলাম মুস্তাফা এগিয়ে এসেছিলেন। সেই থেকে তাঁর মৃত্যুর কিছুকাল পূর্ব পর্যন্ত প্রতি বছর নববর্ষের পূণ্যপ্রভাতে ছায়ানটের শিল্পীদের সাথে সংগীত সুধার সাথে আরেকটি আকর্ষণ ছিলো তাঁর ভরাট কন্ঠের আবৃত্তি। ছায়ানটের নববর্ষের আয়োজন কেবল একটি অনুষ্ঠানই ছিলো না, এটা ছিলো পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

চিরকালের সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক, মুক্ত মনের শিল্পী, রুচিশীল, সংস্কৃতিমনা ও পরিপূর্ণ আধুনিক মানুষ গোলাম মুস্তাফা ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে দূরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। তাঁর রচিত শিল্প কর্ম ঘেরা জীবনটিকে সযত্নে আগলে রেখেই এই শিল্পী ২০০৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাত ৯:২০ মিনিটে পরলোক গমন করেন।

গোলাম মুস্তাফা অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন। তারমধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো- একুশে পদক ২০০১; জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ১৯৮০, ১৯৮৬, ১৯৯০; বাচসাস পুরস্কার ১৯৭৩; উত্তরণ জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার ১৯৭২, ১৯৭৩ ও ১৯৭৫; মাহবুবুল্লাহ ও জেবুন্নেসা জনকল্যাণ ট্রাস্টের স্বর্ণপদক ১৯৮৫। জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার ১৯৭৬। এছাড়াও টেলিভিশন নাট্যশিল্পী নাট্যকার সংস্থার পুরস্কার ১৯৯০।

ব্যক্তি জীবনে ১৯৫৭ সালে গোলাম মুস্তাফা বিয়ে করেন। স্ত্রী হুসনে আর মুস্তাফা এক সময় মঞ্চ ও বেতারে অভিনয় করতেন। স্বনামধন্য অভিনয় শিল্পী ছিলেন তিনি। গোলাম মুস্তাফার ১ মেয়ে, ১ ছেলে। মেয়ে সুবর্ণা মুস্তাফা টেলিভিশন, মঞ্চ ও চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী। ছেলে সুমিত মুস্তাফা স্ত্রী মোনা, কন্যা নাদিয়া ও পুত্র আমান-সহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অঙ্কুর-এ শিশুশিল্পী হিসেবে তিনি অভিনয় করেছেন।

তথ্যসূত্র: গোলাম মুস্তাফা, কর্ম ও জীবন, প্রকাশনী: মওলা ব্রাদার্স, প্রকাশক: আহমেদ মাহমুদুল হক, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি, ২০০৬

লেখক: রেজাউল আহমেদ ও মৌরী তানিয়া

Share on Facebook
Gunijan

© 2017 All rights of Photographs, Audio & video clips and softwares on this site are reserved by .