<bgsound src="flash/guni.wav">
 
Links
 
এ পর্যন্ত পড়েছেন
জন পাঠক
 
 
সর্বমোট জীবনী 323 টি
ক্ষেত্রসমূহ
সাহিত্য ( 37 )
শিল্পকলা ( 18 )
সমাজবিজ্ঞান ( 8 )
দর্শন ( 2 )
শিক্ষা ( 17 )
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ( 8 )
সংগীত ( 10 )
পারফর্মিং আর্ট ( 13 )
প্রকৃতি ও পরিবেশ ( 2 )
গণমাধ্যম ( 8 )
মুক্তিসংগ্রাম ( 156 )
চিকিৎসা বিজ্ঞান ( 3 )
ইতিহাস গবেষণা ( 1 )
স্থাপত্য ( 1 )
সংগঠক ( 8 )
ক্রীড়া ( 6 )
মানবাধিকার ( 2 )
লোকসংস্কৃতি ( 1 )
নারী অধিকার আন্দোলন ( 2 )
আদিবাসী অধিকার আন্দোলন ( 1 )
যন্ত্র সংগীত ( 0 )
উচ্চাঙ্গ সংগীত ( 1 )
আইন ( 1 )
আলোকচিত্র ( 3 )
সাহিত্য গবেষণা ( 0 )
ট্রাস্টি বোর্ড ( 12 )
নেত্রকোণার গুণীজন
উপদেষ্টা পরিষদ
গুণীজন ট্রাষ্ট-এর ইতিহাস
"গুণীজন"- এর পেছনে যাঁরা
Online Exhibition
 
 

GUNIJAN-The Eminent
 
হালিমা খাতুন
 
 
trans
খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেই ছোট্ট মেয়েটি ছোটে ফুল কুড়োতে। হালকা শিশির ভেজা ঘাস মাড়িয়ে কুড়োতে যায় শিউলি। শিউলি ফোটা শেষ। বেলী, বকুল তো আছে! কোঁচড় ভরে ফুল কুড়িয়ে বাড়ি ফেরে। এবার মালা গাঁথার পালা। সুঁই এ সুতো পরিয়ে মালা গেঁথে তবে সকালের প্রথম কাজ শেষ। খেয়ে দেয়ে এরপর পাঠশালায় যাবার প্রস্তুতি। বাবার তৈরী পাঠশালায় আয়োজন পড়াশুনার। গাছপালা ঘেরা বাড়ির নিঝুম দুপুর; ছোট আর সব ছেলেমেয়েদের সাথে খেলাধূলাময় দুরন্ত বিকেল; খুলনা-বাগেরহাট লাইট রেলওয়ে দিয়ে রেলের কু-ঝিক-ঝিক, এক ঘেয়ে টানা সুরে চলতে থাকা দেখতে দেখতে নামা সন্ধ্যে; আর সন্ধ্যে হলেই দূরের সিনেমা হলে, বেজে ওঠা গান; বাদেকাড়া পাড়ায় ছোট্ট মেয়েটির রঙ্গিন দিনগুলো আবির্তত হয় এভাবেই। জায়গাটা বাগেরহাট শহর থেকেও দূরে নয় খুব। মাত্র ২.৫ মাইল তবে রাস্তাটা কাঁচা।

মেয়েটির নাম হালিমা খাতুন। মামার খাতায় লিপিবদ্ধ ছিল জন্ম-ক্ষন-সন-তারিখ। মামা নেই হারিয়ে গেছে খাতাও। তাতে জন্ম সন পেতে অসুবিধা হয় নি। সার্টিফিকেটের জন্ম তারিখ ২৫-০৩-৩৩। অর্থ্যাৎ ১৯৩৩ সালের ২৫ শে মার্চ । তখন ব্রিটিশ রাজের শাসন।

বাবা মৌলভী আব্দুর রহিম শেখ। কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার স্নাতক । আরবী, ফারসি, বাংলা, ইংরেজী থেকে ঘোড়ায় চড়া সবটাই শিখেছেন সেখানে। রহিম শেখ ছিলেন ‘গুরু ট্রেনিং স্কুলে’র শিক্ষক। বর্তমান কালের টিচার্স ট্রেনিং স্কুলই ছিল তখনকার গুরু ট্রেনিং স্কুল।

কর্মসূত্রে কাজ করেছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়। দেখেছেন মেয়েদের পড়াশুনা, স্কুলে যাওয়া। কিন্তু নিজ গ্রামে মেয়েদের পড়ার সুযোগ না থাকায় নিজেই তৈরী করেন পাঠশালা। অন্যান্য ছেলেমেয়েদের সাথে হালিমার পড়াশুনার শুরু বাবার তৈরী পাঠশালায়। মা দৌলতুন্নেছা। বাবা কর্মসূত্রে বাইরে থাকতেন। মা সারারাত জেগে নকশীকাঁথা সেলাই করতেন। কি অসাধারন ছিল মায়ের হাতের সুঁই সুতার কাজ। নানা বাড়ি ২/৩ মাইল দূরের পাইল পাড়া গ্রাম। জায়গাটা খান জাহান আলীর মাজারের কাছাকাছি। নানা ছিলেন খান জাহান আলীর অনুচরদের বংশধর। জমিদারের নায়েব।

‘বাদেকাড়া পাড়ার’ বাড়িতে ১ ভাই ৭ বোনের বেড়ে ওঠা। আরও ৩ টি ভাই জন্মের কিছুদিন পরই মারা যায়। বাড়িতে পড়াশুনার পরিবেশ ছিল। ভাই বোনরা সবাই পড়াশুনা করতেন। হালিমা তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছেন পাঠশালাতেই। সে সময় বাগের হাটের বিখ্যাত পি সি চন্দ্র কলেজের ছাত্ররা গ্রামের বিভিন্ন অবস্থা সম্পন্ন বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশুনা করতেন। তাদের কাছে পড়তেন বাড়ির ছোটরা মানে হালিমাও। বইপড়া, খেলাধূলা হাতে লেখা পত্রিকা বের করার চর্চা ছিল। পড়া শিখেই যা কিছু পেতেন পড়ে ফেলতেন। আগ্রহ ছিল খুব। শেক্সপিয়ারের ল্যাম্বস্ এর ইজি রিডিং এর সব বই পড়ে ফেলেন।

দুলাভাই গল্পের বই কিনে পাঠাতেন কলকাতা থেকে। মামা আব্দুল বাড়িক ছিলেন প্রভাবশালী ও শক্তিশালী লোক। নানার পর তিনিও জমিদারের নায়েব হন। মামা প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা খুব বেশি না করলেও সমসাময়িক বিভিন্ন পত্রিকা কলকাতা থেকে সংগ্রহ করে আনতেন। বাড়িক মামার আলমারিতে সারা বছরের পত্রিকার সংগ্রহ পেয়ে যান। ফুপাতো ভাই আফতাব সর্দারের বাড়িতে পান বাক্স ভর্তি গল্পের বই। বাংলাদেশের তৎকালিন ছোট লাট ‘ব্রডলি বার্ড’ এর গল্পের বই, ‘বোকার গল্প’ পান সেখানেই, গ্রামীন জনপদের মানুষের গল্প, পড়ে ফেলেন সব।

বড়বোন প্রাইমারীর স্কলারশিপ পেয়েছিলেন বই। সেই সবও পড়া হয়ে যায় হালিমার। আহা্ প্রথম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে খুব অল্প বয়সেই মারা যায় বোনটি। মেজো বোনটিরও ছিল বই পড়বার শখ। দুলভাই বই এনে দিত। বড় ভাই এর ক্লাসের বই এমনকি প্রবেশিকার ইংরেজী মাধ্যমের বইও সব পড়ে ফেলতেন।

স্কুলের নাম ‘মনোমহিনী’। ১৯৪০ সালে বাগেরহাট শহরের মনোমহিনী স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হন। ছাত্রীদের মনকে মোহিত করবার জন্য যতকিছু প্রয়োজন, সব উপকরন সেই স্কুলে পেয়েছেন। সেখানেই তৈরী হয়েছে মন।

এই স্কুলের বিভিন্ন আয়োজনে গান, নাটক, কবিতাতে অংশ নিতেন হালিমা। প্রধান শিক্ষিকা ‘শর্মা হালদার’। তিনি ও তাঁর স্বামী কমিউনিস্ট ছিলেন। যদিও স্কুলে রাজনীতি প্রচার করেন নি। অত্যন্ত ভালোবাসা পেয়েছেন হালিমা তাঁর কাছ থেকে। হালিমাদের পরিবার ছিল কংগ্রেসী। বড় বোনের বিয়ের শাড়ি পর্যন্ত ছিল খদ্দরের। স্কুলে পড়ার সময় ক্লাস ফাইভ এ কংগ্রেসের শিশুদলে যোগ দিয়ে বিভিন্ন মিটিং ও মিছিলে গিয়েছেন। চাচার আগ্রহে। উকিল উদ্দিন উকিল চাচা। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সাথে মনে প্রাণে যুক্ত ছিলেন। পরে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কদম কদম এগিয়ে গেছেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে।

১৯৪৭ সালে মনমোহিনী থেকে প্রবেশিকা পাশ করেন হালিমা খাতুন। প্রবেশিকার পর ভর্তি হন বাগেরহাটের প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজে। মাত্র ৪ জন ছাত্রী ছিল কলেজে যারা বসত সামনের বেঞ্চে। সারা কলেজে যেখানে ছাত্র সংখ্যা ছিল ৫০০ জন। ছেলেদের কলেজে পড়বেন না বলে কান্নাকাটি করলেও ভর্তির পর আর সে সব কিছু মনে রইলো না। এখান থেকেই ১৯৪৯ এ পাশ করেন উচ্চমাধ্যমিক।

বাবার অসুস্থতার কারণে ঢাকাতে না এসে পিসি চন্দ্র কলেজে বিএ পড়েন। পাশ করেন ১৯৫১ সালে। মনের মাটি খুব শক্ত হয়েছে তখন। সারাবিশ্বের প্রগতিবাদীদের সাথে একাত্ব হয়েছেন। শিক্ষকদের সহযোগিতায় তাঁদের দেওয়া বই পড়ে ও ঢাকা থেকে পাওয়া পত্র পত্রিকা তাঁকে করে তোলা রাজনীতি সচেতন। অনুপ্রাণিত হয়েছেন মাওলানা ভাসানীর আদর্শে। রাজনীতি বিষয়টি ছিল অন্তঃসলীলা নদীর মতো। লেখাপড়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল, রাজনীতির আদর্শের পড়াশুনা, বইপত্র পড়া, আলোচনা, কোন বিষয়ে সভা হলে অংশ নেওয়া এ সবের মাঝে। সে কালের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল মুসলিমলীগের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন না বুঝতে পেরে মুসলিম লীগের কর্মী তালিকা থেকে নাম কেটে পার্টির চাঁদা ২৫ পয়সা ফেরত দেওয়া হয় তাঁকে। মুসলিম লীগ থেকে বের করে দেয়া হয় তাঁকে ।

আলোচিত রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডে নিহতদের একজন তাঁর সাথে দেখা করতে এসে গ্রেফতার হয়েছিলেন পুলিশের হাতে। গ্রামে এক দুর্ধর্ষ ডাকাতকে গ্রেফতার করতে এসেছিল পুলিশ। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে সেই দিনটিতে বিপ্লবী আসেন গ্রামে। পুলিশ বিপ্লবীর দেখা পেয়ে গ্রেফতার করে নেয়, হালিমার সাথে তাঁর কথা বা দেখা হবার আগেই। পরে নির্মম ভাবে গুলিতে মৃত্যু।

তখন ঢাকা আসা কঠিন। স্টীমারে খুলনা থেকে বরিশাল হয়ে চাঁদপুর। এক রাত কেটে যেতো স্টীমারে। পরদিন নারায়ণগঞ্জ নেমে ট্রেনে ঢাকা ফুলবাড়ী স্টেশন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির এতো কড়াকড়ি ছিল না তখন। এক আত্মীয় মারফত দরখাস্ত করেন। ইংলিশের শিক্ষক ছিলেন টার্নার। উনি বললেন এসে দেখা করতে। দেখা করলেন। টার্নার বললেন- ‘তুমি তো বেশ ভালো ইংরেজী বলো, কই শিখেছো?’ হালিমা দুষ্টমি করে উত্তর দেন ‘সুন্দরবনের কাছের মানুষ বাঘ ভাল্লুকের কাছ থেকে শেখা’। তুমি তো বেশ চালাক মেয়ে। ভর্তি হয়ে গেলেন এমএ তে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ঢাকায় এসেই দেখেন উত্তপ্ত দেশ। ভাষার দাবিতে। পাকিস্তানি শাসকদের চাপিয়ে দেওয়া একমাত্র রাষ্ট্রভাষা উর্দু গ্রহণে অসম্মত ছাত্ররা। ভাষা আন্দোলন দানা বাঁধে আরও আগে ৪৮ এ তখন তিনি বাগেরহাটে। সে সময় যারা ঢাকায় পড়তো তাদের মুখে আর পত্র পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারতেন সে সব খবর। তাঁরাও বাগেরহাটে মিছিল মিটিং করেছেন এ সময়। ৫১ তে চলে আসেন ঢাকায়, যুক্ত হন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে। কমিউনিস্ট নেত্রী বরিশালের মেয়ে জুঁইফুল রায়ের মাধ্যমে পার্টির সাথে যোগাযোগ বাড়তে থাকে। জুঁইফুল ছিলেন কমরেড খোকা রায়ের স্ত্রী । ওয়ারেন্ট থাকায় আত্মগোপনে থাকতেন। জুঁইফুল বোরকা পড়ে রাবেয়া আপা বা ভাবী ছদ্মনামে হালিমার সাথে দেখা করতে আসতেন । পাকিস্তান সরকার নিপীড়ন শুরু করেছে, অনেক ছাত্র শিক্ষক জেলে। পার্টির সাথে ও নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ আরও বাড়তে থাকে। কমিউনিস্ট নেতা মনি সিং, ময়মনসিংহের এক বড় ভাই, রোকেয়া কবির পরবর্তীতে ইডেন কলেজের প্রফেসর, লেখিকা দৌলতুন্নেছা, সেলিনা বেগম পরবর্তীতে সংসদ সদস্য, সুফিয়া খান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, কেজি মোস্তফা, ওলী আহাদ এবং জেলের বাহিরে ঐ সময়ে সমস্ত নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ তৈরী হয়। চালিয়ে যেতে থাকেন ভাষার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচী।

এসেমব্লীতে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। ধীরেন দত্ত প্রতিবাদ করেন। নাজিম উদ্দিন চুক্তি করে ভঙ্গ করেন। ছাত্ররা ক্ষুদ্ধ হয়। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্র ভাষার দাবিতে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ছাত্ররা। তাদের কথা উর্দুর পরিবর্তে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবি নয় তাদের। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবি। তাও এত কার্পণ্য কেন। ফেব্রুয়ারী থেকেই গাজীউল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা, সামসুল আলম, কেজি মোস্তফা, আব্দুস সামাদ আজাদ সবাই মিলে মিটিং মিছিল করেছেন। এখন যেখানে জগন্নাথ হল সেখানে ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সংসদ ভবন। ঐখানেই বাজেট অধিবেশনে উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা এই বিলটি পাশ করা হবে। সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম কমিটি এর বিরোধিতা করে। ২১শে ফেব্রুয়ারী সারা ঢাকায় ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। স্কুল, কলেজসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা সংসদ ঘেরাও করবে এই বিল পাশ না করার দাবিতে। দেওয়া হবে স্মারক লিপি।

২০ তারিখ রাতে বার লাইব্রেরীর সভায় তমুদ্দিন মুজলিশসহ সকল ছাত্র সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। মিটিংএ সিদ্ধান্ত হয় কলা ভবনের সামনে সকলে জড়ো হবে। এখন যেখানে ঢাকা মেডিকেলের এমার্জেন্সি সেখানেই ছিল ঢাবি কলা ভবন। মুসলিম লীগ ১৪৪ ধারা জারি করে। ৪ জনের বেশি জড়ো হতে পারবে না । ২০ তারিখ আওয়ামীলীগ অফিসে মিটিং হয়। কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। ১৪৪ ধারা না ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত হয় ভোটে। কার্জন হলের পুকুর পাড়ের সিঁড়িতে, এসএম হলে মিটিং হয়। মিটিং করেন আব্দুল মতিন, সুলতান প্রমুখ ছাত্রনেতারা। হালিমার উপর দায়িত্ব পড়ে মুসলিম গার্লস হাইস্কুল, বাংলা বাজার গার্লস হাইস্কুল, মিডফোর্ড মেডিকেল স্কুলের শিক্ষার্থীদের পিকেটিং করে নিয়ে আসার। মিডফোর্ডের LMF কোর্সের মেয়েদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হত। মিটিং, মিছিলে আসতো তারা। বাংলা বাজার গার্লস স্কুলের মেয়েদের সাথে আগেও যোগাযোগ ছিল। পরিচয়ের সুবাদে দারোয়ান স্কুলে ঢুকতে দিত না। খুব কড়া প্রধান শিক্ষিকার নির্দেশে গেট তালাবদ্ধ করে রাখতো। মেয়েরা পূর্ব প্রস্তুতিতে দেওয়ালের ইট খুলে রেখেছিল। ঐ ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসে মেয়েরা। জুলেখা, পারুল সহ আরও কয়েকজন। এছাড়া সেন্ট্রাল জেলের সামনের আনোয়ারা খাতুন মুসলিম গার্লস স্কুলের ছাত্রীদেরও বের করে নিয়ে আসেন। এক সাংবাদিক সে সময় ছবিও তোলেন। এক স্কুল ছাত্রী নুড়ির মা মিটিং এ আসার অপরাধে নুড়ির চুল কেটে দিয়েছিল। নুড়ি তবু ওড়না পরে চলে আসে।

সে সময় তিনি ঢাকায় নতুন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের মেয়েরা তাঁর কথা না শুনতে পারে তাই তাদের অনুপ্রাণিত করতে তিনি সে সময়ের পরিচিত নেত্রী নাদেরা বেগমের কাছে যান একটি চিঠি লিখে নিয়ে আসতে। সংগে ছিল তার লোকাল গার্ডিয়ান। নাদেরা বেগম কবির চৌধুরী, মুনির চৌধুরীর বোন। ১৯৪৮ সাল থেকে ভাষা আন্দোলনের সাথে যুক্ত। পুলিশের সাথে ফাইট করেছেন জেল খেটেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেন। সম্ভবতঃ নাদেরা তখন গৃহবন্দি ছিলেন। হালিমা খাতুন নাদেরা বেগমের কাছ থেকে চিঠি লিখে নিয়ে এসে হলের ছাত্রীদের পড়ে শুনান। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শের ৪/৫ জন ছাড়া বিশেষ কেউ রাজী হলো না। আর ২/১ জন সাধারণ ছাত্রী ছিল ২১ তারিখে। ২১ তারিখ সকালেও হালিমা হোস্টেলে যান মেয়েদের বের করে আনতে। এসেছিলেন ছাফিয়া খাতুন, স্পিকার ওহাব সাহেবের মেয়ে সামসুন্নাহার, বিশ্ববিদ্যালয়ের আর একজন মেয়ে বোরকা পড়ায় বোরকা শামছুন নামে পরিচিত ছিল, তিনি, জুলি হোসনে আরা প্রমুখ বের হয়েছিলেন। ১১ টার দিকে মিটিং শুরু হলো। সভাপতি গাজীউল হক। ছাত্রনেতা মতিন উপস্থিত। ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা হবে কি না সিদ্ধান্তে আসা হয়নি তখনও। আওয়ামীলীগ সেক্রেটারী সামছুল হক বললেন- ভাঙ্গা হবে না। সামনে নির্বাচন গোলমাল হলে পিছিয়ে যাবে নির্বাচন। সুতরাং মিটিং করে চলে যাই। আব্দুল মতিন বললেন সম্মিলিত ছাত্রজনতার উদ্দেশ্যে- ‘কি ১৪৪ ধারা ভাঙ্গবো?’ উপস্থিত সবাই বললেন -‘ভাঙ্গবো ভাঙ্গবো’। ছোট ছাত্রীরা বললেন- ‘১৪৪ ধারা ১০০ বার ভাঙ্গবো’। সিদ্ধান্ত হলো ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার। ছাত্ররা ১০ জন করে একটি দল ও ছাত্রীরা ৪ জন করে। ৩ জন স্কুলের ও ১ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী দিয়ে সাজানো হবে দল। ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে এগিয়ে যাবে তাঁরা। হালিমা মেয়েদের প্রথম দলে নেতৃত্ব দেন। তাঁর সাথে ছিলেন জুলেখা, পারুল, সেতারা। দ্বিতীয় দলে ছিলেন হোসনে আরা জুলি, সামসুন্নেছা, আক্তারী পরে ইডেন কলেজের প্রফেসর হয়েছিলেন, আরও একজন মেয়ে। তৃতীয় দলে ছিলেন ডা. ছাফিয়া পরে এরশাদ সরকারের মন্ত্রী হন। আরও ৩ জন।

প্রথমে হালিমা খাতুন তাঁর দল নিয়ে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’, চল চল এসেমব্লীতে চল স্লোগানে বেরিয়ে এসে পুলিশের বন্দুকের নল জোর করে সরিয়ে এগিয়ে গেলেন। পরবর্তী দলও একই কাজ করে। প্রথম ২ টি দল দেখে পুলিশ বুঝতে পারেনি কি করবে। পরের ২ টি দলকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এবার ছাত্ররা বন্যার পানির মতো বেরিয়ে আসে। টিআর গ্যাস, লাঠি চার্জ শুরু হয়। স্লোগানে স্লোগানে মুখর এলাকা। কিছু ছাত্র গ্রেফতার হয়। সাধারণ জনতা রিক্সাওয়ালা মিছিলে যোগ দেয়। ভলান্টিয়ারদের এগিয়ে দেওয়া পানিতে চোখ ভিজিয়ে আবার চলতে থাকেন হালিমা। শেষে মেডিকেল ইমার্জেন্সিতে ঢুকে First Aid নিয়ে আবার রাস্তায় নামেন। পুরানো আর্টস বিল্ডিং, যেখানে পুরানো সাইনবোর্ডে লেখা আছে এখানে প্রথম ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা হয়েছিল ৫২ সালে। ছাত্ররা সেই পুরানো আর্টস বিল্ডিং এর একটি দরজা ভেঙ্গেই জোর করে বেরিয়ে আসে। বর্তমান শহীদ মিনারের কাছে ছিল মেডিকেল ছাত্রদের বাঁশ ও টিনের তৈরী ছাত্রাবাস। ছাত্ররা মেডিকেল কমপাউন্ডে জড়ো হয়। সেখানেই স্তূপিকৃত সংস্কার কাজে ব্যবহৃত ইট ছুঁড়ে ছাত্ররা পাল্টা জাবাব দিচ্ছিল। হালিমা তাঁর বন্ধু সুলতানুজ্জামান খানকে নিষেধ করেন। ইট মেরো না বিপদ হতে পারে। কে শোনে কার কথা। আর এগুতে পারলেন না। ৩ টার দিকে পুলিশ গুলি শুরু করে। হালিমা রয়ে গেলেন ওখানে। চোখের সামনে স্ট্রেচারে করে আহত নিহতদের নিয়ে আসতে লাগলো। তাদের আর্তনাদে ভারী এলাকা। তবুও ইচ্ছা এসেমব্লীতে যাবেন। রক্তে ঘাস মাটি ভিজে যাচ্ছে স্লোগানে মুখর রণক্ষেত্র।

আহতদের সান্ত্বনা দিতে মেডিকেলে ঢোকেন। প্রচুর লাশ। রাতে পুলিশ নিয়ে যায় কিছু লাশ। সেগুলোর আর হদিস পাওয়া যায়নি। কিছু ছাত্র পুলিশের পিছু পিছু গিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে কবর চিহ্নিত করে আসে। তাই বরকত, সালামের কবরের চিহ্ন পাওয়া যায়। গুলি চলতে থাকে, বেলা শেষে শহীদ মিনার রক্তের সমুদ্রে পরিণত হয়। অনেক রক্ত ভেজা জামাকাপড় গাছের ডালে ঝোলানো। যেন বাংলাদেশের পতাকার লাল সূর্য। রফিকের মাথার খুলি ভেঙ্গে মগজ ছড়িয়ে আছে, যেন বকুল ফুল।

আমানুল হক ছবি তোলেন সেসবের। ব্লক করতে পাঠান পাইওনিয়ার প্রেসে। সে ব্লক রাখা হয় হালিমার সহপাঠী ব্যাচমেট অর্থনীতির এসএ কিবরিয়ার ঘরে। পরে মন্ত্রী হন তিনি। কিবরিয়া থাকতেন এসএম হলে। পুলিশ এসএম হলের অনেককে গ্রেফতার করে। অনেকে পালিয়ে যান। হল দখল করে বেলকোনিতে বালির বস্তা রেখে তার পিছনে অবস্থান নেয় পুলিশ। কিবরিয়ার রুম প্রভোস্টের বাড়ির সাথে লাগানো ছিল। কিবরিয়া হল ছেড়ে চলে যান। তবে যাবার আগে দরজায় খিল দিয়ে যান। হালিমা প্রভোস্টের বাসায় বেড়াতে গিয়ে কৌশলে ২৩ তারিখে বন্ধু রাবেয়াকে সাথে নিয়ে কিবরিয়ার রুমে ঢুকে আলমারী থেকে ব্লকটা বুকের মাঝে নিয়ে চলে আসেন। অসীম সাহসিকতার সাথে সেব্লকটা যদি তিনি সেদিন নিয়ে না আসতেন তাহলে এখন আর সেই মুল্যবান ছবিগুলো পাওয়া যেতো না। ইতিহাসের খণ্ডগুলো এভাবেই হালিমার জীবনের সাথে একাকার হয়ে আছে।

২২ ফেব্রুয়ারীও বিশাল মিছিল হয়। সেখানেও গুলি হয়। নিহত হয়। মিছিল হয় রক্তে ভেজা জামা নিয়ে। ২৩ তারিখ রাতে শহীদ স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ শুরু হয়। ২৪ তারিখ শেষ হয়। কিন্তু ২৬ তারিখে পুলিশ তা ভেঙ্গে দেয়। ক্রমবর্ধমান গণ আন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৬ সালে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি প্রদান করে।

১৯৯৯ সালে ইউনোস্কো ২১ ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে যা বৈশ্বিক পর্যায়ে সাংবার্ষিক ভাবে গভীর শ্রদ্ধা ও যথাযথ মর্যাদার সাথে উদযাপন করা হয়।

২১ ফেব্রুয়ারীর পর পার্টির নির্দেশে প্রথম কাজ হয় চাঁদা তোলা। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে আন্দোলনে আহতদের জন্য এবং আন্দোলনের জন্য চাঁদা তোলার নির্দেশ এলো পার্টি থেকে। হালিমারা চাঁদা তুললেন। চললো পোস্টার লেখা, বিলি করা, ছাত্র ছাত্রী বা মহিলাদের মধ্যে প্রচার করা। আন্দোলনের সময় হোস্টেল বন্ধ হয়ে যায়। পরে হোস্টেল খুললে হলে ফিরে এলেন হালিমা খাতুন। শুরু হলো ইলেকশনের প্রস্তুতি। কাজ করতে থাকেন গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্টের পক্ষে। মুসলিম লীগের বিপক্ষে। খান সারোওয়ার মোর্শেদের স্ত্রী নুরজাহান এ সময় ইলেকশনে দাঁড়ান। তিনি তাঁর পক্ষে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, পুরান ঢাকায় স্কোয়াড তৈরী করে নদীর পানি খেয়ে মাঠের ক্ষিরা খেয়ে দিন রাত ক্যাম্পেইন করেন। সামসুন্নাহার মাহমুদ পরাজিত হন নুরজাহানের কাছে।

ইলেকশনের কাজ করতে গিয়ে হালিমা খাতুনের পড়াশুনা ব্যাহত হলো। তাছাড়া পুলিশের হয়রানি ও গ্রেফতার আতংক তো ছিল। যদিও পুলিশের ভিতর আত্মীয় থাকায় হালিমাকে জেলে যেতে হয়নি অনেকের মতো। বন্ধু ডাক্তার ফরিদার বড় ভাই ছিলেন মোজ্জফফর, পুলিশের ডিএসপি। বিভিন্ন পুলিশি তৎপরতা তাঁকে পূর্বেই জানাতেন। নির্দেশনাও দিতেন। কলেজের বন্ধু সাইফুলের ভাইও পুলিশে ছিলেন। তাঁরা হালিমাকে প্রোটেকশন দিতেন।

তবুও আন্দোলনের পর ১৯৫২ সালে নিরাপত্তার জন্য কলকাতা চলে গেলেন তিনি। কিছুদিন থাকলেন সেখানে। বিপ্লবী নেত্রী ইলা মিত্রের সাথে পূর্ব পরিচয় ছিল যখন ইলা হসপিটালে ছিলেন। কলকাতাতে ইলামিত্রের সাথে পুনরায় যোগাযোগ হয়। সেখানেও পার্টির কাজ করতে থাকেন। ওয়েলিংটন স্কোয়ারে বিশাল মিটিংএ বক্তৃতা করলেন হালিমা।

ইলেকশনের পর পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হলো। ১৯৫৩ সালে খুলনায় চলে এলেন। খুলনা করনেশন স্কুল ও গার্লস কলেজ একই কমপাউন্ডে ছিল। তার সেক্রেটারি ছিলেন আলী আজগর লবির বাবা হাফেজ সাহেব। সেখানকার প্রধান শিক্ষিকা রিজিয়া বেগম কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। তিনি হালিমা খাতুনকে এখানে নিয়ে এলেন। সেখানে তিনি ছাত্রীদের মাঝে আন্দোলন প্রচার করলেন। সকাল বেলা কলেজ ও দুপুর বেলা স্কুল চলতো। হোস্টেলে থাকতেন ছাত্রীদের পড়াতেন। খুলনাতে ১৯৫৩ সালে হালিমার নেতৃত্বে মেয়েদের নিয়ে প্রথম প্রভাত ফেরী হলো ২১ শে ফেব্রুয়ারী স্মরণে। প্রভাত ফেরীর মাধ্যমে খুলনা শহরের সব বাড়ীর সব কটি জানালা খুলে গেলো। ২১ শের চেতনার প্রভাত ফেরীর সূচনা হলো খুলনা শহরে। এদিকে ঢাকাতে ১৯৫৩ সালে অনেক মেয়ে গ্রেফতার হলো। এতো গ্রেফতার যে জায়গার অভাবে ক্যাম্প করে রাখতে হলো মেয়েদের। এসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. জুবেরী দায়িত্ব পান রাজশাহী ইউনিভার্সিটি করার। উনি রাজশাহী ইউনিভার্সিটির প্রথম ভিসি। তিনি তখন রাজশাহীতে মেয়েদের জন্য একটি কলেজও করলেন এবং লোক পাঠিয়ে খুলনা থেকে হালিমাকে নিয়ে এসে চাকুরী দিলেন। ইংরেজী পড়াবার জন্য সেই মেয়েদের কলেজে। পড়ানোর পশাপাশি এসময় হালিমা রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে বাংলায় এমএ করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তখন বাংলার চেয়ারম্যান ছিলেন। ২ বছর পর কলেজ বন্ধ হয়ে গেলো। মেয়েরা তখন কো-এ্যাডুকেশনের কলেজে ভর্তি হতে শুরু করেছে। তখন তিনি রাজশাহী টিসার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড করেন। এসময় তার দুলাভাই টিটি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমেরিকার অর্থে এম এড পড়াবার জন্য ড. মরিসন IER শুরু করেন। হালিমা ১৯৬১ সালে IER এর লেকচারার হন। এবং ড. মরিসন এর উৎসাহে আমেরিকার university of northern collorado, collorado state college এ Phd করেন। একারণে ২ বছর আমেরিকাতে থাকেন। বিষয় ছিল primary education and children literacher. ১৯৬৮ সালে Phd শেষ করেন।

১৯৬২ সালে বিয়ে করেন। যদিও খুব সফল ছিল না তা। বিয়ের পর স্বামীর কর্মস্থল হায়দারাবাদে চলে যান। ফিরে আসেন সন্তান সম্ভবা হয়ে। তাঁর এক মাত্র মেয়ে প্রজ্ঞা লাবণী। বর্তমানে কানাডা প্রবাসী।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধর সময় ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারে। ২৫ মার্চ সেই কাল রাতেও ছিলেন সেখানে। সারারাত গোলাগুলি, ইকবাল হল এ লাশের স্তূপ। চারিদিকে রক্ত, আগুন, কারফিউ। কোন মতে বেঁচে থেকেছেন দেশ একদিন স্বাধীন হবে এই আশায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে IER বিভাগে দীর্ঘদিন শিক্ষকতার পর ২ বছর নেপালে ইউনেস্কোর পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯৭ সালে অবসরে যান। তখন থেকে ঢাকার ইন্দিরা রোডের নিজ বাড়িতে অবসর জীবন যাপন করছেন লেখালেখিকে সঙ্গী করে। সেলাই করবার ও পাখির পালক সংগ্রহ করার শখছিল একসময়।

কর্মসূত্রে ভ্রমণ করেছেন জাপান, ইউরোপ, কানাডা, রাশিয়া, শ্রীলঙ্কা, কোরিয়া,ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপিন। বাংলা, ইংরেজী ,ফ্রেঞ্চ ছাড়া জানেন নেপাল, জাপান,রাশিয়া, ও শ্রীলংকার ভাষা।

তাঁর প্রথম বই বাংলা একাডেমী থেকে সোনা পুতুলের বিয়ে। শিশুদের জন্য বই লিখেছেন প্রায় ৫০ টি। বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান ১৯৮১ সালে।

বইটার নাম ‘সবচেয়ে সুন্দর’। তার নিচে লিখা- হালিমা খাতুন। লেখক। ছোটোরা এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলে ‘সবচেয়ে সুন্দর হালিমা খাতুন’। লেখালেখি শুরু করার পর থেকে হালিমা খাতুন ছোটোদের কাছে সব চেয়ে প্রিয় হয়ে ওঠেন। ভেতরে টেলিফোন হাতে এক ছাগল ছানার ছবি ও গল্প। হারিয়ে যাওয়া ছাগল ছানা। কি সুন্দর তার বর্ণনা ভঙ্গিমা। হেসে কুটি কুটি হয় ছোটরা। ছোটদের গায়ে কাতুকুতু দিলেই তারা হেসে ওঠে। কিন্তু সদ্য পড়তে শেখা ছোটদের গল্প পড়িয়ে হাসানো কঠিন কাজ। সেই কাজটিই করেছেন হালিমা খাতুন। ইতিহাস তাঁকে হয়তো মনে রাখবে ভাষাসৈনিক হিসেবে। কিন্তু বাংলা ভাষার জন্য যিনি সংগ্রাম করেছেন বাংলা ভাষাকে সুন্দর নির্মাণে ছোটদের কাছে সুন্দর করে উপস্থাপনা করবার জন্য সমপরিমান মমতাও দেখিয়েছেন তিনি। নিরীক্ষা করেছেন ছোটদের পঠন পাঠন উপযোগী গল্প, ছড়া,কবিতা নির্মাণে, বাংলা, ইংরেজী দুই ভাষাতেই। অনেক পরিচয়ের মাঝে এ দু’টো পরিচয়ই তাঁকে সমান মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। সময় তাঁকে হয়তো এভাবেই মনে রাখবে।

তথ্যসূত্রঃ সাক্ষাৎকার- ভাসাসৈনিক হালিমা খাতুন, ২৮.০২.১৬

দৈনিক ইত্তেফাক ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা দিবসের বিশেষ সংখ্যা

লেখক: রাজিত আলম পুলক

Share on Facebook
Gunijan

© 2017 All rights of Photographs, Audio & video clips and softwares on this site are reserved by .