<bgsound src="flash/guni.wav">
 
Links
 
এ পর্যন্ত পড়েছেন
জন পাঠক
 
 
সর্বমোট জীবনী 320 টি
ক্ষেত্রসমূহ
সাহিত্য ( 37 )
শিল্পকলা ( 18 )
সমাজবিজ্ঞান ( 8 )
দর্শন ( 2 )
শিক্ষা ( 17 )
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ( 8 )
সংগীত ( 10 )
পারফর্মিং আর্ট ( 12 )
প্রকৃতি ও পরিবেশ ( 2 )
গণমাধ্যম ( 8 )
মুক্তিসংগ্রাম ( 155 )
চিকিৎসা বিজ্ঞান ( 3 )
ইতিহাস গবেষণা ( 1 )
স্থাপত্য ( 1 )
সংগঠক ( 8 )
ক্রীড়া ( 6 )
মানবাধিকার ( 2 )
লোকসংস্কৃতি ( 1 )
নারী অধিকার আন্দোলন ( 2 )
আদিবাসী অধিকার আন্দোলন ( 1 )
যন্ত্র সংগীত ( 0 )
উচ্চাঙ্গ সংগীত ( 0 )
আইন ( 1 )
আলোকচিত্র ( 3 )
সাহিত্য গবেষণা ( 0 )
ট্রাস্টি বোর্ড ( 12 )
( 0 )
Hacked By leol_3t ( 0 )
নেত্রকোণার গুণীজন
উপদেষ্টা পরিষদ
গুণীজন ট্রাষ্ট-এর ইতিহাস
"গুণীজন"- এর পেছনে যাঁরা
Online Exhibition
 
 

GUNIJAN-The Eminent
 
সৈয়দ হাসান ইমাম
 
 
trans
সালটা ১৯৪২। বর্ধমানের টাউন স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান। বিভিন্ন খেলাধুলা চলছে। ছোটদের গ্রুপের একটি খেলায় প্রথম হলো তৃতীয় শ্রেণীর ছয়-সাত বছরের একটা ছেলে। বড়দের গ্রুপে প্রথম হয় দশম শ্রেণীর ছাত্র ধীরেন। এখন পুরস্কার নেবার পালা। প্রধান অতিথি, ইংরেজ ম্যাজিষ্ট্রেট বেল সাহেব এলেন তার স্ত্রীকে সাথে নিয়ে। তিনি, স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষকরা সবাই উপস্থিত। অধীর আগ্রহে ছাত্ররা মাঠে বসে অপেক্ষা করছে। হঠাৎ ধীরেন সবার কানে কানে বলল, “ যখন আমাকে পুরস্কার নিতে ডাকবে তখন আমি দাঁড়িয়ে বলব, কোন ইংরেজের কাছ থেকে আমরা পুরস্কার নেব না। এই বলে আমি হাঁটা দেব, তোরাও আমার সঙ্গে সঙ্গে চলে আসবি।” ধীরেনের কথা অনুযায়ী সবাই তার পিছু পিছু চলে গেল। শুরু হলো হুলস্থুল। তাদের স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হবে ঘটনা এমন একটা পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ালো। পরে অবশ্য তাদের আর বের করে দেয়া হয়নি। সেভাবেই সেই সময়ে ইংরেজবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হওয়া ছয়-সাত বছরের ছেলেটি - সৈয়দ হাসান ইমাম । তিনি বাংলাদেশের একজন অন্যতম অভিনেতা ও পরিচালক। স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলনসহ যেকোন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।

সৈয়দ হাসান ইমাম এর জন্ম ১৯৩৫ সালের ২৭ জুলাই ভারতের বর্ধমানে, তাঁর নানাবাড়ীতে। বাগেরহাটে হযরত খান জাহান আলী মাজারের কাছেই রণ বিজয়পুকুর তাঁর দাদাবাড়ী । বাগেরহাট শহরে তাঁদের একশো বছরের পুরনো বাড়ি। পাঁচ পুরুষ ধরে তাঁরা থাকতেন সেখানে। দাদা খান বাহাদুর সুলতান আলী পেশায় একজন আইনজীবি ছিলেন এবং রাজনীতিও করতেন। তিনি শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের বন্ধু ছিলেন এবং তাঁর সাথে “কৃষক প্রজা পার্টি” করতেন। পরে তিনি ফজলুল হক সাহেবের সাথে মুসলীম লীগে যোগ দেন। তিনি যুক্ত বাংলার মেম্বার অফ দ্যা লেজিসলেটিভ আ্যসেম্বলীর সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি রাজনীতি ছেড়ে বাগেরহাট বারে প্রাকটিস করেন এবং কয়েকবার তিনি বারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। হাসান ইমাম-এর বাবা সৈয়দ সোলায়মান আলী একজন ইনকাম ট্যাক্স অফিসার ছিলেন। মাত্র দু’বছর বয়সে বাবাকে হারান হাসান ইমাম। একুশ বছর বয়সে তাঁর মা সৈয়দা সঈদা খাতুন বিধবা হন। হাসান ইমামরা ছিলেন দুই ভাই। বড় ভাই সৈয়দ আলী ইমাম। তাঁদের বাবার শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাঁর মা দুই ছেলেকে নিয়ে তাঁর বাবার বাড়ি বর্ধমান চলে যান। কারণ সেখানে লেখাপড়ার পরিবেশ ভাল ছিল। বর্ধমানের পার্কার রোডের দুই নম্বর বাড়িটি ছিল তাঁর নানারবাড়ী। তাঁর নানা আবুল হাশিম মুসলিম লীগের সম্পাদক ছিলেন। তাঁর নানাবাড়ীর সবাই প্রায় পাঁচ পুরুষ ধরে রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তাঁরা সংস্কৃতিমনা ও প্রগতিশীল ছিলেন। মামারা কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। বড়মামা সৈয়দ শহীদুল্লাহ্ বর্ধমান জেলার কমিউনিষ্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে তিনি সিপিআইএমের এমপি হয়েছিলেন। মেজমামা মনসুর হাবিবুল্লাহ তেভাগা আন্দোলনের সময় কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি পশ্চিম বঙ্গ আ্যসেম্বলীর স্পীকার হন। বাড়িটি পরে তাঁরা সিপিআইএম-কে দিয়ে দেন।

হাসান ইমাম ছয় বছর বয়সে বর্ধমান টাউন স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হন। এই টাউন স্কুল থেকে তিনি ১৯৫২ সালে এস.এস.সি. পাস করেন। এরপর বর্ধমানের রাজ কলেজ থেকে ১৯৫৪ সালে এইচ. এস. সি. পড়ার শেষে তিনি বর্ধমানে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পড়াশুনা করেন। সেসময় তিনি পশ্চিম বঙ্গের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং আ্যসোসিয়েশনের জেনারেল সেক্রেটারী নির্বাচিত হন। তিনি আন্দোলন করে প্রথম কনডেন্স কোর্স চালু করেন। সেসময় ডিপ্লোমা পড়া শেষ করে ডিগ্রী পড়ার জন্য আবার পুরোটাই পড়তে হত। হাসান ইমামই প্রথম আন্দোলন করে দুই বছর কম পড়ার অনুমোদন পান। এটাই কনডেন্স কোর্স। পড়াশুনা শেষ করে ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে বর্ধমান থেকে দেশে ফিরেন।

পূর্ব পাকিস্তানে এসে ১৯৫৭ সালে তিনি প্রথমে দর্শনা সুগারমিলে নয় মাস চাকুরী করেন। দর্শনা সুগার মিলে চাকুরীরত অবস্থায় তিনি একবার ঢাকায় আসেন। বঙ্গবন্ধু তখন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর এক বন্ধু নুরুদ্দীন সাহেব তখন পিরোজপুরের আওয়ামী লীগের এমপি, বড় ব্যবসায়ী এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের বোর্ড অব ডিরেক্টরস্ এর মেম্বার ছিলেন। নুরুদ্দীন সাহেবের মেয়ের জন্মদিন। বঙ্গবন্ধুসহ অনেকেই সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার জন্য হাসান ইমামকে নিয়ে যাওয়া হয়। নুরুদ্দীন সাহেব হাসান ইমামের গান শুনে মুগ্ধ হন এবং তাঁকে ঢাকায় একটা চাকরি দেয়ার জন্য রশিদ সাহেবকে বলেন। রশিদ সাহেব তখন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তনের জোনাল ম্যানেজার ছিলেন। তিনি হাসান ইমামকে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে চাকুরী দেন। এই ব্যাংকে চাকুরী পাওয়ার পর দর্শনা সুগার মিলে আর যাননি তিনি। ১৯৬৫ সালের দিকে হাসান ইমাম যখন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে শ্রেষ্ঠ নায়ক হিসেবে পুরস্কার পান তখনও তিনি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে চাকুরী করতেন কিন্ত অভিনয়ের জন্য ব্যাংকে নিয়মিত যেতে পারতেন না। কিছুদিন পর তিনি ব্যাংকের চাকুরী ছেড়ে দেন এবং চলচ্চিত্রে নিয়মিত হন।

হাসান ইমাম যখন বর্ধমান রাজ কলেজের ছাত্র তখন ছাত্র সংগঠন নির্বাচনে কংগ্রেসকে হারিয়ে বামপন্থীরা ক্যাবিনেট গঠন করেন। তুষার কাঞ্জিলাল দলের জেনারেল সেক্রেটারী এবং হাসান ইমাম কমনরুম সম্পাদক নিযুক্ত হন। দেখতে সুদর্শন হওয়ায় রাজ কলেজের বার্ষিক কালচারাল অনুষ্ঠানে সবাই হাসান ইমামকে নাটক করার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু হাসান ইমাম বলেন, “আমি তো কখনো অভিনয় করিনি। গান, আবৃত্তি করেছি। আমি অভিনয় পারবনা।” সবাই বলেন, অসুবিধা নেই, তুই পারবি। হাসান ইমাম রাজী হন। তাঁকে মিসর কুমারী নামক নাটকে অভিনয় করতে বলা হয় । মজার ব্যাপার মিসর কুমারী নাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্র মিসর কুমারী অর্থাৎ মেয়ের ভূমিকায় অভিনয় করতে হয় তাঁকে। কারণ তখন ছেলেমেয়েদের একসাথে নাটক করা নিষিদ্ধ ছিল, তাই তাঁকে মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করতে হয়। অন্য একটি দল “তাইতো” নামক একটি নাটক মঞ্চায়নের অনুমতি পেয়েছিল। সেই নাটকে হাসান ইমাম নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন। এভাবেই তার অভিনয় জীবনের শুরু বলা যায়। সেখানে তিনি একই রাতে প্রথমে “তাইতো” নাটকে নায়কের চরিত্রে এবং পরে “মিসর কুমারী” নাটকে নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেন। তখন থেকে তিনি অভিনয়ের মাধ্যমে বেশ পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৫৮ সালের দিকে ঢাকায় ব্যাংকে চাকুরীর সুবাদে যখন স্থায়ী হন, তখন গেন্ডারিয়ায় ইসট্যান্ড ক্লাবে “বন্ধু” নামক একটি নাটকে নায়ক হিসেবে ঢাকায় প্রথম মঞ্চে অভিনয় করেন। বন্ধু নাটকের সংগীত পরিচালক শেখ লুৎফর রহমানের ছোট ভাই শেখ মহিতুল হক তাঁর অভিনয়ে আকৃষ্ট হয়ে তাঁর ভগ্নিপতি চলচ্চিত্র পরিচালক মহিউদ্দিন সাহেবের কাছে হাসান ইমামকে নিয়ে যান। তিনি তাঁকে দেখে ‘রাজা এল শহরে’ চলচ্চিত্রে তিন নায়কের এক নায়ক নির্বাচিত করেন। এরপর ‘জানাজানি’ ও ‘ধারাপাত’ নামক চলচ্চিত্রে চুক্তিবদ্ধ হন। এভাবে ১৯৬০ সালে তিনি একসাথে তিনটি চলচ্চিত্রে চুক্তিবদ্ধ হন। পরবর্তীতে তাঁর তৃতীয় চুক্তিবদ্ধ চলচ্চিত্রটি প্রথম রিলিজ হয় আর প্রথম চলচ্চিত্রটি রিলিজ হয় তৃতীয় চলচ্চিত্র হিসেবে। এছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলি হলো- ‘সারেং বৌ’, ‘কাগজের নৌকা’, ‘আনারকলি’, ‘শীত বিকেল’, ‘মেঘলা আকাশ’, ‘মনের মানুষ’, ‘উজালা’ ইত্যাদি।

১৯৬১ সালে পৃথিবীব্যাপী রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি চলছিল। তখন পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রচর্চা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। হাসান ইমামরা সরকারের বিপরীতে রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবার্ষিকী পালন করেন। তিনি ড্রামা সার্কেল প্রযোজিত ‘তাসের দেশ’, ‘রাজা ও রানী’ এবং ‘রক্তকরবী’ নাটকে প্রধান চরিত্রে মঞ্চে অভিনয় করেন এবং গানের অনুষ্ঠানে গানও করেন। ১৯৬৫ সালে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে খান আতাউর রহমানের ‘অনেক দিনের চেনা’ নামক চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে পুরস্কার পান তিনি। ১৯৬৯ সালে মস্কোতে আর্ন্তজাতিক চলচ্চিত্র ফেস্টিভ্যালে হাসান ইমাম অভিনীত চলচ্চিত্র ‘সোঁয়ে নদীয়া জাগে পানি’ পাকিস্তান থেকে প্রতিনিধিত্ব করে এবং এক ভোটের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হতে পারেননি।

১৯৬৬ থেকে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব সময়ে তিনি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের মঞ্চে নাটক-নাটিকা ও গণসঙ্গীত পরিচালনা করেন। হাসান ইমাম পরিচালিত নাটকগুলোর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’, ম্যাক্সিম গোর্কীর ‘মা’, সোমেন চন্দের ‘না’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ১৯৬৯-এর গণ আন্দোলনের সময় প্রায় ১০ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে বাংলা একাডেমীর বটমূলে মঞ্চায়িত সংস্কৃতি সংসদ আয়োাজিত রক্তকরবী নাটকটি বিপুল সাড়া জাগিয়েছিল।

১৯৬৪ সালে বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই তিনি নিয়মিত নাটক করেন। টেলিভিশনে তাঁর অভিনীত দেড়শতাধিক নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হলো- মুস্তফা মনোয়াার নির্দেশিত শেক্সপিয়ারের ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’, রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’, মোস্তফা কামাল প্রযোজিত ‘স্বপ্ন বিলাস’, ‘দম্পতি’, ‘এত আলো এত ছায়া’ ইত্যাদি।

হাসান ইমাম খুব ভাল গান গাইতেন। মাত্র এক বছর তিনি শুধাংশু বাবুর কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম নেন। বর্ধমানে তিনি বিভিন্ন মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করতেন এবং আবৃত্তি করতেন। ১৯৫২ সালে অনুষ্ঠিত ‘অল ইন্ডিয়া ইয়ুথ ফেস্টিভ্যাল’-এ রবীন্দ্র সংগীতে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। ১৯৫৫ সালে কলেজের অনুষ্ঠানে তাঁর গান শুনে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় তাঁকে বিনা পারিশ্রমিকে গান শেখানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। গলায় ফেনিনজাইটিস হওয়ার কারণে গানটা আর পেশা হিসেবে নেননি তিনি।

ছেলেবেলা থেকেই হাসান ইমাম খেলাধুলায় বেশ ভাল ছিলেন। তার প্রিয় খেলা ছিল ক্রিকেট ও ফুটবল। তিনি স্কুলে, জেলায়, এবং প্রদেশের হয়ে ক্রিকেট খেলতেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় টিমের ওপেনিং ব্যাটসম্যান ও উইকেটকিপার হিসেবে খেলেছেন। তিনি চুনী গোস্বামী ও পিকে ব্যানার্জির মতো নামকরা খেলোয়াড়দের সাথে ফুটবল খেলতেন। একবার ফুটবল খেলতে গিয়ে তার পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। তারপর থেকে আর ফুটবল খেলতে পারেননি। তিনি চাইলে একজন ভাল ক্রিকেটারও হতে পারতেন।

বর্ধমানে হাসান ইমামের নানাবাড়িতে রাজনৈতিক নেতাদের আসা-যাওয়া ছিল নিয়মিত। কারণ বাড়িটি ছিল তৎকালীন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর মেজোমামা কৃষকদের অধিকার রক্ষার আন্দোলন করতে গিয়ে ধরা পড়েন ও রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে গুলি খান। ছেলেবেলায় এবিষয়গুলো তাঁকে বেশ প্রভাবিত করেছে। ১৯৪৮ সালে যখন কংগ্রেস গভর্নমেন্ট কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ করে তখন তাঁর মামা-মামী ও বড় ভাই আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। হাসান ইমামের বয়স তখন মাত্র তের-চৌদ্দ বছর। এই কিশোরটিই তখন বাড়িতে একমাত্র পুরুষ মানুষ। কারো অসুখ হলে গভীর রাতে ডাক্তার ডেকে আনত, ঔষধ কিনে আন্ডারগ্রাউন্ডে পৌঁছে দিত। মাত্র তের বছর বয়সে বর্ধমান থেকে ট্রেনে চড়ে রাজশাহী জেলখানায় যেয়ে দরখাস্ত করে ঔষধ দিয়ে আবার ফিরে আসতেন। তাঁর মা খুব সাহসী ছিলেন। এসব কাজে কখনো বারণ করেননি। এভাবে বিশাল এক রাজনৈতিক পরিমন্ডলে তিনি বেড়ে ওঠেন। এই পরিবেশের গভীর প্রভাব তার মধ্যে পড়ে।

হাসান ইমাম ছাত্রজীবনে ছাত্র রাজনীতি করতেন। তিনি মানুষের পক্ষে সব আন্দোলনেই যুক্ত ছিলেন। এরপর ১৯৪৫-৪৬ সালে রেড ফোর্টে সুভাষ বসুর আইএনএ ফোর্স-এর বিচার বিরোধ আন্দোলনে অংশ নেন এবং মাত্র ১০-১১ বছর বয়সে ইংরেজদের লাঠিপেটা খান। স্কুলজীবনেই তিনি প্রত্যক্ষ করেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ব্রিটিশ ভারত ছাড় আন্দোলন, দেশজুড়ে ইংরেজ শাসনের দমননীতি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে তিনি যুক্ত হন স্কুলজীবনেই। কলেজে ভর্তি হয়েও রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিরোধী আন্দোলন ও ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তাঁর চারজন শিষ্য পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনি দলীয় রাজনীতি করতেন না, জাতীয় রাজনীতি করতেন। কারণ তাঁর কোন আকাঙ্খা ছিল না। বঙ্গবন্ধু তাঁকে খুব ছোট বয়স থেকে চিনতেন। বঙ্গবন্ধু যখন ছাত্র রাজনীতি করতেন তখন বঙ্গবন্ধুদের নেতা ছিলেন হাসান ইমাম-এর নানা আবুল হাশিম। একারণে বঙ্গবন্ধু হাসান ইমামের নানা আবুল হাশিমের কাছে যেতেন এবং তখন থেকেই তিনি হাসান ইমামকে চিনতেন।

১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় হাসান ইমাম বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’ নামে শিল্পীদের একটি সংগঠন তৈরী করেন। সেখানে তিনি আহ্বায়ক ছিলেন। ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পাকিস্তান বেতার ও টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বর্জন করে। গণ আন্দোলনের চাপে পাকিস্তান সরকার ৮ মার্চ থেকে বেতার- টেলিভিশনের দায়িত্ব ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’-এর হাতে ছেড়ে দেয়। ফলে ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’ ৮ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সফলভাবে টেলিভিশনে দুর্দান্ত সব অনুষ্ঠান প্রচার করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় হাসান ইমাম স্বাধীন বাংলা বেতারে সংবাদ পাঠ করেন এবং নাট্য বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন। এসময় জহির রায়হানকে সভাপতি ও হাসান ইমামকে সাধারণ সম্পাদক করে মুজিবনগরে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী ও কলাকুশলী সমিতি গঠন করা হয়, যাদের উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য চলচ্চিত্র দলিল ‘স্টপ জেনোসাইড’ ও মুক্তিযুদ্ধের অমূল্য চলচ্চিত্র দলিল প্রামাণ্য চিত্র নির্মিত হয়।

হাসান ইমাম শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি গঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সভাপতি হিসেবে। জাহানারা ইমামের মৃত্যুর পর বাংলাদেশের প্রধান মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পান হাসান ইমাম। মুক্তিযুদ্ধের পর সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটানোর উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠায় হাসান ইমাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে মানুষের মনোজগতের স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য শিল্পকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠা করা হয়। শিল্পীদের প্রথাগত উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে স্কলারশিপের ব্যাপারেও তাঁর অগ্রণী ভূমিকা ছিল।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে এবং জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের দাবিতে হাসান ইমামের ভূমিকা ছিল দৃঢ়। স্বাধীনতা বিরোধী চক্র হাসান ইমামকে কয়েকবার হত্যার চেষ্টা করে। যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে, পল্টনে কমিউনিস্ট পার্টির সভায় এবং ছায়ানটের পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা হামলার সময় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তিনি। তখন মৌলবাদী প্রচার মাধ্যমগুলো নৃশংস এ বোমা হামলার জন্য তাঁকেই অভিযুক্ত করে মিথ্যা প্রচারণা চালাতে থাকে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসার পর হাসান ইমামকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। তিনি ৭ বছর দেশের বাইরে ছিলেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি আবার দেশে ফিরে আসেন। হাসান ইমাম টেলিভিশন নাট্যকার, নাট্যশিল্পী সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন সুদীর্ঘ ৩৮ বছর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা চক্রান্তের উপর নির্মিত আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ পরিচালনার কাজেও তিনি নিয়োজিত ছিলেন। নাটকটি তাঁর নির্দেশনায় সফলভাবে মঞ্চায়িত হয় ২০০৪ সালের ২৮ মার্চ লন্ডনের লোগান হলে। পরে তাঁর পরিচালনায় নিউইয়র্কেও দুবার অভিনীত হয়।

হাসান ইমাম জনদরদী ও মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ। ১৯৭০ সালে ১২ নভেম্বর যে জলোচ্ছ্বাস হয়, তাতে প্রায় ১০ লাখ মানুষ মারা যায়। হাসান ইমাম,ওয়াহিদুল হক এবং চিত্রশিল্পী কামরুল হাসানসহ অনেকে মিলে “দূর্যোগ নিরোধ আন্দোলন কমিটি” নামে একটি সংগঠন তৈরী করে জলোচ্ছ্বাস আক্রান্তদের রিলিফ দিয়ে সাহায্য করেন। পরে সরকারী অনুদানে পটুয়াখালীতে দুমাস থেকে তাঁরা আক্রান্তদের প্রায় চার হাজার বাড়ী বানিয়ে দেন। আশির দশকে দিনাজপুরে একবার বড় বন্যা হয়েছিল, সেখানেও ত্রাণকাজে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি সামাজিক সংকট নিবারণের কাজে কখনও পিছিয়ে থাকেননি।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কাল রাত্রির পর হাসান ইমাম ২৭ মার্চ সাভারের কাছে রাজফুলবাড়ীয়ায় তাঁর এক নানীর বাড়ীতে সপরিবারে আশ্রয় নেন। স্ত্রী, মা, ভাই এবং একমাত্র মেয়েকে রেখে মাগুরায় যেয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন হাসান ইমাম। তিনি অস্ত্র যোগাড় করতে কলকাতায়ও গিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালে তাজউদ্দিন আহমদ যখন সরকার গঠন করেন তখন স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের নাট্য বিভাগের প্রধানের দায়িত্বে নিযুক্ত হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় হাসান ইমাম মুজিবনগর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সালেহ আহমেদ নামে সংবাদ পাঠ করতেন।

সৈয়দ হাসান ইমাম ১৯৬৫ সালের ৩০ জুন নৃত্যশিল্পী লায়লা হাসানকে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন। লায়লা হাসান বাংলাদেশ জাতীয় নৃত্যশিল্পী সংস্থার সভাপতি, বাংলাদেশ টেলিভিশন আপীল বোর্ড এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য। বাংলাদেশের নৃত্যাঙ্গনে অবদানের জন্য ২০১০ সালে তাঁকে একুশে পদক প্রদান করা হয়। এই দম্পতির তিন সন্তান। বড় মেয়ে সৈয়দা তানজীনা ইমাম সঙ্গীতা ভিকারুননিসা নূন স্কুলে শিক্ষকতা করেন এবং সেই সঙ্গে ছোটদের নৃত্যের প্রশিক্ষণ দেন। মেজমেয়ে সৈয়দা রুমনাজ ইমাম রুমঝুম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। বর্তমানে কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ছেলে সবার ছোট। তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে ওয়াশিংটনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে খন্ডকালীন অধ্যাপনা করছেন এবং একটি কোম্পানীর আঞ্চলিক প্রধানের পদে চাকুরীরত আছেন।

সৈয়দ হাসান ইমাম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ও শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে জাতীয় চলচ্চিত্র ও সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার পান। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য সিকোয়েন্স পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৯ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়া বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৬ সালে তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কার, ২০১৬ লাভ করেন।

হাসান ইমাম রবীন্দ্রনাথের চেতনায় বিশ্বাসী, রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনাদর্শ। নতুনদের উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে চান---“পুরানো জানিয়া চেয়োনা আমারে আধেক আঁখির কোণে অলস অন্যমনে।”

তথ্যসূত্র: সরাসরি সাক্ষাৎকার, ২৫/১২/২০১৬, ৮৬, বড় মগবাজার, ঢাকা। “সৈয়দ হাসান ইমামের ৭৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপিত”, দৈনিক ইত্তেফাক। ২৯ জুলাই, ২০১০। “চিরপথের সঙ্গী আমার”। দৈনিক প্রথম আলো। ২৭ জুলাই, ২০১০। ইউটিউবে বিবিসি সাক্ষাৎকার।

লেখক: ইশরাত জাহান দিলরুবা।

Share on Facebook
Gunijan

© 2018 All rights of Photographs, Audio & video clips and softwares on this site are reserved by .