<bgsound src="flash/guni.wav">
 
Links
 
এ পর্যন্ত পড়েছেন
জন পাঠক
 
 
সর্বমোট জীবনী 320 টি
ক্ষেত্রসমূহ
সাহিত্য ( 37 )
শিল্পকলা ( 18 )
সমাজবিজ্ঞান ( 8 )
দর্শন ( 2 )
শিক্ষা ( 17 )
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ( 8 )
সংগীত ( 10 )
পারফর্মিং আর্ট ( 12 )
প্রকৃতি ও পরিবেশ ( 2 )
গণমাধ্যম ( 8 )
মুক্তিসংগ্রাম ( 155 )
চিকিৎসা বিজ্ঞান ( 3 )
ইতিহাস গবেষণা ( 1 )
স্থাপত্য ( 1 )
সংগঠক ( 8 )
ক্রীড়া ( 6 )
মানবাধিকার ( 2 )
লোকসংস্কৃতি ( 1 )
নারী অধিকার আন্দোলন ( 2 )
আদিবাসী অধিকার আন্দোলন ( 1 )
যন্ত্র সংগীত ( 0 )
উচ্চাঙ্গ সংগীত ( 0 )
আইন ( 1 )
আলোকচিত্র ( 3 )
সাহিত্য গবেষণা ( 0 )
ট্রাস্টি বোর্ড ( 12 )
নেত্রকোণার গুণীজন
উপদেষ্টা পরিষদ
গুণীজন ট্রাষ্ট-এর ইতিহাস
"গুণীজন"- এর পেছনে যাঁরা
Online Exhibition
 
 

GUNIJAN-The Eminent
 
শম্ভু আচার্য
 
 
trans
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ খুবই উদ্দীপ্ত করে শিল্পী শম্ভু আচার্যকে। তখন তাঁর বয়স মাত্র সতের-আঠার বছর। রেডিও পাকিস্তান থেকে সেই ভাষণ পরের দিন ৮ মার্চ প্রচার করা হয়। তখন তাঁদের গ্রামে মাত্র দু'টি রেডিও ছিল। অবস্থাপন্ন এক প্রতিবেশীর বাড়িতে সেই ভাষণ শোনার জন্য যান শম্ভু আচার্য। সেই ভাষণ শুনতে শুনতে নিজের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা অনুভব করেন তিনি। তাঁর বাবাও সেই ভাষণ শুনেছিলেন। তিনি ছিলেন উত্তেজিত।

সেইদিন বিকেল বেলা শম্ভু আচার্য নিজেদের উঠোনে বসে পটের জমিন তৈরি করছিলেন। পাশেই তাঁর বাবা সুধীর আচার্য ১১-১২টা দা বালুতে ধার দিচ্ছিলেন। তাঁদের বাড়িতে সব সময়ই এই দাগুলো থাকত। কারণ তাঁর বাবা প্রতিমা গড়ার কাজে এই দাগুলো ব্যবহার করতেন। তাঁর মা কমলাবালা স্বামীকে সবগুলো দা'য়ে শান দিতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, এখন চৈত্র মাসেই কেন দা শান দিচ্ছ? সাধারণত দুর্গা পূজার আগে আগে অর্থাৎ আশ্বিন মাসে এসব দা কাজে লাগে। সুধীর আচার্য স্ত্রীকে বললেন, 'তুমি এসব বুঝবে না। বঙ্গবন্ধু বলছে 'যার যা আছে তাই নিয়ে তৈরি' থাকতে। আমার তো আর কিছু নাই তাই এই দা'গুলোই শান দিয়ে রাখছি। বলা তো যায় না কখন কাজে লাগে। আর বঙ্গবন্ধুর কথা শুনতে হবে না।' শম্ভু আচার্য বাবার এই কথা শুনে মনে সাহস পেলেন। ভাবলেন কখন এগুলো কাজে লাগবে।

তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় সেই দাগুলো কাজে লাগেনি শম্ভু আচার্য বা তাঁর বাবা সুধীর আচার্যের। কারণ তাঁদের গ্রামে সেইভাবে কোনোদিন পাকিস্তানি মিলিটারি আসেনি। হঠাৎ দু-এক'দিন তারা যখন আসত তখন গ্রামের লোকজনদের সাথে তাঁর পরিবারের সদস্যরা সবাই ভয়ে অন্য গ্রামে পালিয়ে যেতেন। কিন্তু মিলিটারিরা তেমন কোনো ক্ষতি না করে চলে যেত। মিলিটারিরা ফিরে যাওয়ার পর গ্রামের লোকদের সাথে তাঁরা আবার নিজ গ্রামে ফিরে আসতেন। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস শম্ভু আচার্যের পরিবারের সদস্যরা নিজের গ্রামে থেকে ছবি এঁকেছেন।

মুক্তিযুদ্ধই সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে শিল্পী শম্ভু আচার্যকে। মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দেশব্যাপী গণহত্যা, বর্বরতা, নির্যাতন, শোষণ এসব বিষয়ই তাঁর শিল্পীসত্তাকে প্রতিনিয়ত আহত করেছে। তিনি ভাবলেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁকে কিছু ছবি আঁকতে হবে। আর তাই চুয়াত্তর সাল থেকেই শুরু করেন সেই কাজ। তিনি ২৪ খণ্ডে কয়েক হাজার ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছেন ১৮৫৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ইতিহাসের একটি পটশিল্প। তিনি এর নাম দিয়েছেন 'মহাপুরুষের অন্তর্ধান : সহি শহীদ মুজিবনামা'।

এই ছবিগুলোতে বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংগ্রামের ইতিহাস বিধৃত করা হয়েছে। বলা যেতে পারে, পটশিল্পী শম্ভু আচার্যের জীবনে এটাই সবচেয়ে বড় কাজ। যে কাজ দিয়ে তিনি দেশ-মাটি-মানুষ-প্রকৃতির প্রতি নিজের দায়বদ্ধতাকে প্রকাশ করেছেন।

শম্ভু আচার্যের জন্ম ১৯৫৪ সালে মুন্সিগঞ্জ জেলার মীরকাদিম উপজেলার কালিন্দি পাড়া গ্রামে। তাঁর বাবার নাম সুধীর কুমার আচার্য, মা কমলাবালা আচার্য। তাঁরাও শিল্পী ছিলেন বংশ-পরম্পরায়।

শিল্পী শম্ভু আচার্য জীবনে কোনোদিন কোনো প্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে শিল্পকলা শেখেননি। পটচিত্র আঁকা তিনি শিখেছেন বংশ-পরম্পরায়। বলা যেতে পারে প্রায় সাড়ে চারশ' বছর ধরে পারিবারিকভাবে এই কাজ করে চলেছেন তাঁরা। পারিবারিক ধারাবাহিকতায় শম্ভু আচার্যও নিরবিচ্ছিন্নভাবে পটচিত্র এঁকে চলেছেন। তিনি তাঁর পটশিল্প দিয়ে শহুরে নাগরিক জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর বাবা সুধীর আচার্যও প্রচুর সুনাম পেয়েছিলেন নাগরিক শিল্পবোদ্ধাদের কাছ থেকে। সে সময় পটুয়া কামরুল হাসানের উদ্যোগে তৈরি হওয়া প্রতিষ্ঠান 'কারুশিল্পী পরিষদ' দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লৌকিক ঐতিহ্যের সন্ধানে বেশ কিছু কাজ করে। ১৯৭৭ সালে তারাই আবিষ্কার করে শিল্পী সুধীর আচার্যকে। এক সময় শিল্পী শম্ভু আচার্য এই সংগঠনটির সদস্য হন।

শিল্পী শম্ভু আচার্য মনে করেন তাঁর পরিবারই তাঁর মহান প্রতিষ্ঠান। তাঁর পাঠশালা। এখনও তিনি সেই পাঠশালাতেই পড়ালেখা করছেন। শম্ভু আচার্যের কাছে তাঁর নয় পূর্বপুরুষেরই ছবি আছে। এখানে তাঁর পূর্বপুরুষ রামগোপাল আচার্য কাজ শিখেছেন রামলোচন আচার্যের কাছ থেকে। রামসুন্দর আচার্যকে কাজ শিখিয়েছেন তাঁর বাবা রাম গোপাল আচার্য। রামসুন্দর আচার্য কাজ শিখিয়েছেন তাঁর ছেলে রামকৃষ্ণ আচার্যকে। প্রাণকৃষ্ণ আচার্য কাজ শিখেছেন তাঁর বাবা রামকৃষ্ণ আচার্যের কাছ থেকে। শম্ভু আচার্যের বাবা সুধীর আচার্য কাজ শিখেছেন প্রাণকৃষ্ণ আচার্যের কাছ থেকে। আবার শম্ভু আচার্য কাজ শিখেছেন তাঁর বাবা সুধীর আচার্যের কাছ থেকে। তবে তিনি তাঁর দাদা প্রাণকৃষ্ণ আচার্যের কাছ থেকেও কাজ শিখেছেন। শম্ভু আচার্য তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে তাঁর দাদাকে সারাসরি কাজ করতে দেখেছেন। তাঁর মা কমলাবালার কাছ থেকেও তিনি কাজ শিখেছেন।

'পট' মানে হচ্ছে পটভূমি। কোনো বিশেষ একটি ঘটনার পটভূমি। যেমন-রামায়ণ, মহাভারত, মনসামঙ্গল, মহররম, গাজীর গীত ইত্যাদি। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে সব ছবি আঁকা হয় তাই 'পটচিত্র'। এগুলো নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই আঁকা হয়। যেমন গাজীর পটের উপর সাতাশটি প্যানেলে ২৭টি চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলা হয়। আবার শ্রীকৃষ্ণের পট অনেক। শ্রীকৃষ্ণের লীলা নিয়ে অনেক পটচিত্র আঁকা যায়। শম্ভু আচার্য এই পটচিত্রেরই শিল্পী। বাংলাদেশে তিনিই একমাত্র শিল্পী যিনি বংশ-পরম্পরায় প্রায় সাড়ে চারশ' বছরের ঐতিহ্যকে ধারণ করে নিরবে নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে তিনি গতানুগতিক ধারা থেকে বের হয়ে এসে নতুন মাত্রায় কাজ করতে শুরু করেছেন। শুধু ঐতিহাসিক বিষয়ের উপরেই তিনি পটচিত্র আঁকেননি। এই সমাজে বাসবাসকারী নানা পেশার মানুষের জীবন নিয়ে তিনি পটচিত্র এঁকেছেন। বিশেষত যেসব পেশার ঐতিহ্য রয়েছে, যেমন-কামার, কুমার, জেলে, তাঁতী ইত্যাদি। এগুলোকে শিল্পী বলছেন 'কৃষ্টিপট'। তবে বর্তমানে 'কৃষ্টিপট', 'মুক্তিযুদ্ধ', 'গাজীর পট' এগুলোতেই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে মানুষ।

শিল্পী শম্ভু আচার্যের লেখাপড়ার হাতেখড়ি নিজ বাড়িতেই। পরে তিনি গ্রামের বিনোদপুর রাজকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস থ্রি-তে ভর্তি হন। এখানে তিনি ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরে আর লেখাপড়া করেননি। মাঝখানে কিছুদিন নারায়ণগঞ্জে ব্যানার লেখার কাজ শেখেন। পরে পরিপূর্ণভাবে ছবি আঁকার জগতেই চলে যান। ছবি আঁকার জগতে তিনি আসেন অক্ষরজ্ঞান হবার আগেই। তাঁর বয়স যখন দুই বছর তখনি তিনি ছবি আঁকতে শুরু করেন। ছেলেবেলা থেকেই হাতের কাছে পান নিজের বাপ-দাদার তুলি আর রঙ। নিজের মনে সেগুলো ব্যবহার করেই আঁকতে শুরু করে দেন ফুল, পাখি, লতাপাতা, পশু ইত্যাদি। সেই বয়সে যারাই তাঁর কাজ দেখেছে তারাই বলেছে, এ ছেলে তো অক্ষর জ্ঞান হবার আগেই ছবি আঁকতে শিখে গেছে। নিশ্চয়ই একদিন বড় কিছু হবে। তবে শম্ভু আচার্য বড় কিছু হ্বার জন্য এই পটশিল্প আঁকেন না। তিনি নিজে ছবি আঁকা ছাড়া বাঁচতে পারেন না বলেই ছবি আঁকেন। ছবি আঁকাই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। ছবি আঁকার মধ্যেই তাঁর রুটি-রুজি।

ছেলেবেলায় মানুষের যেমন খেলার সাথী থাকে তেমন কেউ ছিল না শম্ভু আচার্যের। তিনি কোনোদিন ওইভাবে আড্ডায় যাননি। শম্ভু আচার্য বলেন, আমি আর আমার ছবি, আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু। আমি সারাদিন একটা কাজই করি আর তা হচ্ছে ছবি আঁকা।

শম্ভু আচার্য ছোটবেলা থেকেই দেখেছেন সকালবেলা রঙ তুলি নিয়ে তাঁর বাবা আর দাদা চলে যেতেন কোনো একটা গাছের নিচে। সেখানে পটের জমিন তৈরি করতেন তাঁরা। দুপুরে রোদে শুকিয়ে বিকেলে তাতে ছবি আঁকার কাজ শুরু করতেন। একজন কৃষক যেমন সকালবেলা নিজের ক্ষেতে কাজ করতে যান, ঠিক তেমনি আচার্য পরিবারের পটশিল্পীরাও সকালবেলায় নেমে পড়েন জমিন তৈরির কাজে। শিল্পী শম্ভু আচার্য এখনও সেই ধারাই বহাল রেখে চলেছেন। তাঁর কাজে কোনো অবসর নেই। ছবি আঁকাই তাঁর কছে অবসর। কোনোদিন ছবি না এঁকে বসে থাকলে তাঁর মনে হয় তিনি ক্লান্তি বোধ করছেন।

পারিবারিকভাবে পটচিত্র যাঁরা আঁকেন তাঁরা সাধারণত নিজেদের তৈরি করা রঙ দিয়েই কাজ করেন। এসব রঙ বাজারে কেনা কোনো রঙ নয়। এগুলো তৈরি করা হয় দেশজ-ভেষজ উপাদান দিয়ে। শম্ভু আচার্য নিজে এসব রঙ তৈরি করেন। ইটের গুড়া, তেঁতুল বিচি, বেল ইত্যাদি দিয়ে পটচিত্রের রঙ তৈরি হয়। নিজের বাড়িতেই ভেষজ অনেক গাছ ছিল শম্ভু আচার্যের। কিন্তু কালের পরিক্রমায় তা আজ অনেকটাই কমে এসেছে। তবে তিনি নিজে কীভাবে রঙ তৈরি করেন তা আর এখন কাউকে বলেন না। কারণ তিনি তাঁর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছেন এগুলো মানুষ অপব্যবহার করে। শিল্পী শম্ভু আচার্য বিশ্বাস করেন এই সব দেশিয়-ভেষজ রঙ দেশের কথা বলে, হৃদয়ের কথা বলে। এই রঙ বাজারে কেনা রঙের চেয়ে আলাদা। এর মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা নেই।

২০০৬ সালে গ্যালারি কায়ার উদ্যোগে যমুনা রিসোর্টে একটি কর্মশালা পরিচালনা করেছিলেন শিল্পী শম্ভু আচার্য। যেখানে তিনি এসব রঙের দ্রব্যগুণ ও পটচিত্র সম্পর্কে এদেশের গুণী শিল্পীদের হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়েছিলেন। সেই কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, নিতুন কুন্ডু, আমিনুল ইসলাম, হামিদুজ্জামান, কাজী বশির, তরুণ ঘোষ, কালিদাস কর্মকার, শাহজাহান বিকাশ, মাসুদা আলী প্রমুখ। শিল্পী শম্ভু আচার্য এসব শিল্পীদের সাহচর্যে আসতে পেরে খুবই গর্ববোধ করেন। এপর্যন্ত অনেকেই শিল্পী শম্ভু আচর্যকে নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করেছেন। দেশ-বিদেশে অনেক মিউজিয়ামে তাঁর ছবিও রয়েছে। কিছুকাল আগে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউরোপিয় ইউনিয়ন নিজেদের উদ্যোগে একটি আর্ট স্কুল ও স্টুডিও করার জন্য তাঁর বাড়িটি তিনতলা পর্যন্ত পাকা করে দিতে চেয়েছিল কিন্তু তিনি তা নেননি। তাঁর মতে, "ছবি আঁকার মন থাকলে সব জায়গাতেই ছবি আঁকা যায়। আমি প্রকৃতির মধ্যেই ছবি আঁকতে ভালবাসি। সারাজীবন সেভাবেই ছবি এঁকে যেতে চাই। এটা আমার বাপ-দাদার কাজ, সেই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চাই। শহুরে জীবন-যন্ত্রণা আমার ভাল লাগে না। কৃত্রিমতা আমার একেবারেই অপছন্দ। আমি চাই না আমার ছবিতে সেই কৃত্রিমতা আসুক। সেই কারণে আমি কোনো প্রদর্শনীতে যাই না। যদি আধুনিক রঙের প্রভাব আমার উপরে পড়ে। সে কারণেই আমি এগুলোকে এভোয়েট করে চলতে চাই।" প্রকৃতির মধ্যে ছবি আঁকতে ভালবাসেন বলেই তিনি এখনও মুন্সিগঞ্জে তাঁর বাপ-দাদার আমলের সেই বাড়িতে বসেই ছবি এঁকে চলেছেন অবিরাম।

তবে তিনি নিজেই স্বীকার করেন, তাঁর ছবি সময়ের প্রভাবে অনেক বেশি পরিবর্তিত হচ্ছে। নাগরিক জীবনের প্রভাব পড়ছে পটে। শিল্পী শম্ভু আচার্য ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি একক প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। তার মধ্যে রয়েছে ২০০৩ সালে গ্যালারি চিত্রকে, ২০০৬ সালে গ্যালারি কায়ায়, ২০০৭ সালে আলিয়ঁস ফ্রঁসেসে। এছাড়াও ২০০৭ ও ২০০৮ সালে চীনে তিনি দু'টি প্রদর্শনীতে অংশ নেন। এবং ১৯৯৫ সালে অংশ নেন ইন্দোনেশিয়ায় একটি প্রদর্শনীতে। ১৯৯৯ সালে তাঁর পটচিত্র দিয়েই লণ্ডনে বাংলাদেশ ফেস্টিভাল উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও টনি ব্লেয়ার।

তবে একটি ঘটনা সারা জীবন মনে থাকবে শিল্পী শম্ভু আচার্যের। নব্বই-এর দশকের শেষ দিকে তিনি একবার শিল্পকলা একাডেমীর আমন্ত্রণে প্রদর্শনী করতে আসেন ঢাকায়। সেই প্রদর্শনীতেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদারের। তিনি শিল্পী শম্ভু আচার্যকে প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনীর জন্য আর্থিক ও মানসিকভাবে অনেক সহযোগিতা করেছেন। এই দেশে পটশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তাঁকে নানাভাবে উৎসাহিত করেছেন তিনি। রামেন্দু মজুমদারের সাথে পরিচয়কে জীবনের একটি 'মাহেন্দ্রক্ষণ' হিসেবে দেখেন শিল্পী শম্ভু আচার্য।

শিল্পী শম্ভু আচার্য বিয়ে করেন পপি আচার্যকে। তাঁদের এক ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলে অভিষেক আচার্য বাবার মতো অক্ষর-জ্ঞান হবার আগেই ছবি আঁকা শিখেছে। প্রতিনিয়তই সে ছবি আঁকে। মেয়েরাও লেখাপড়ার পাশাপাশি ছবি আঁকে। আর ছবি আঁকেন স্ত্রী পপি আচার্যও।

সংক্ষিপ্ত জীবনী: জন্ম: শম্ভু আচার্যের জন্ম ১৯৫৪ সালে মুন্সিগঞ্জ জেলার মীরকাদিম উপজেলার কালিন্দি পাড়া গ্রামে।

বাবা-মা: তাঁর বাবার নাম সুধীর কুমার আচার্য, মা কমলাবালা আচার্য। তাঁরাও শিল্পী ছিলেন বংশ-পরম্পরায়।

পড়াশুনা: শিল্পী শম্ভু আচার্যের লেখাপড়ার হাতেখড়ি নিজ বাড়িতেই। পরে তিনি গ্রামের বিনোদপুর রাজকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস থ্রি-তে ভর্তি হন। এখানে তিনি ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরে আর লেখাপড়া করেননি। মাঝখানে কিছুদিন নারায়ণগঞ্জে ব্যানার লেখার কাজ শেখেন। পরে পরিপূর্ণভাবে ছবি আঁকার জগতেই চলে যান।

সংসার জীবন: শিল্পী শম্ভু আচার্য বিয়ে করেন পপি আচার্যকে। তাঁদের এক ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলে অভিষেক আচার্য বাবার মতো অক্ষর-জ্ঞান হবার আগেই ছবি আঁকা শিখেছে। প্রতিনিয়তই সে ছবি আঁকে। মেয়েরাও লেখাপড়ার পাশাপাশি ছবি আঁকে। আর ছবি আঁকেন স্ত্রী পপি আচার্যও।

তথ্যসূত্র: ফেব্রুয়ারী, ২০১০-এ শিল্পী শম্ভু আচার্যের নেয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।

লেখক : চন্দন সাহা রায়

Share on Facebook
Gunijan

© 2017 All rights of Photographs, Audio & video clips and softwares on this site are reserved by .