<bgsound src="flash/guni.wav">
 
Links
 
এ পর্যন্ত পড়েছেন
জন পাঠক
 
 
সর্বমোট জীবনী 311 টি
ক্ষেত্রসমূহ
সাহিত্য ( 37 )
শিল্পকলা ( 18 )
সমাজবিজ্ঞান ( 8 )
দর্শন ( 2 )
শিক্ষা ( 16 )
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ( 8 )
সংগীত ( 10 )
পারফর্মিং আর্ট ( 10 )
প্রকৃতি ও পরিবেশ ( 2 )
গণমাধ্যম ( 8 )
মুক্তিসংগ্রাম ( 150 )
চিকিৎসা বিজ্ঞান ( 3 )
ইতিহাস গবেষণা ( 1 )
স্থাপত্য ( 1 )
সংগঠক ( 8 )
ক্রীড়া ( 6 )
মানবাধিকার ( 2 )
লোকসংস্কৃতি ( 0 )
নারী অধিকার আন্দোলন ( 2 )
আদিবাসী অধিকার আন্দোলন ( 1 )
যন্ত্র সংগীত ( 0 )
উচ্চাঙ্গ সংগীত ( 0 )
আইন ( 1 )
আলোকচিত্র ( 3 )
সাহিত্য গবেষণা ( 0 )
ট্রাস্টি বোর্ড ( 12 )
নেত্রকোণার গুণীজন
উপদেষ্টা পরিষদ
গুণীজন ট্রাষ্ট-এর ইতিহাস
"গুণীজন"- এর পেছনে যাঁরা
Online Exhibition
 
 

GUNIJAN-The Eminent
 
আবু হেনা মোস্তফা কামাল
 
 
trans
বাল্যকালেই গানের চর্চা শুরু করেছিলেন তিনি। হতে চেয়েছিলেন গায়ক। মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে নিজেকে বোঝার ক্ষমতা বাড়ে। আবু হেনা মোস্তফা কামালও পরে বুঝেছিলেন গাওয়া নয়, লেখার প্রবণতায় বাঁধা তাঁর জীবনের তার। লেখালেখির শুরুতে তাই কবিতা ও গান রচনার প্রতি ছিল তাঁর মত্ততা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থাতেই রচনা করেছেন অনেক কালজয়ী গান। গীতিকার হিসেবে ওই বয়সেই পেয়েছেন ঈর্ষণীয় সাফল্য। তবে শুধু কবি ও গীতিকার নয় বহু পরিচয়ে বিশিষ্ট ছিলেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গীতিকার, কবি, প্রাবন্ধিক, সমালোচক, অধ্যাপক, গায়ক, বাগ্মী ও টেলিভিশনের উপস্থাপক । প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেন তিনি।

পাবনা জেলার পাবনা থানার গোবিন্দা গ্রামে ১৯৩৬ সালের ১৩ মার্চ আবু হেনা মোস্তফা কামালের জন্ম। বাবা এম. শাহজাহান আলী ছিলেন প্রথম জীবনে স্কুলশিক্ষক, পরে কোনো অফিসের হেডক্লার্ক। অকালেই মারা যান তিনি। আবু হেনা মোস্তফা কামালের মা খালেসুননেসা দীর্ঘজীবী হয়েছিলেন। গান ভালো গাইতেন। ছেলেমেয়েদের মানুষ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। আবু হেনা মোস্তফা কামালরা ছিলেন তিন ভাইবোন। সবার বড় বোন সাবেরা খাতুন শামসুন আরা। সাবেরা খাতুনের স্বামী খ্যাতিমান সাংবাদিক কেজি মুস্তাফা। সেই সূত্রে সাবেরা খাতুন সাবেরা মুস্তাফা নামেই পরিচিত। সাবেরা মুস্তাফা অধ্যাপক এবং মঞ্চ ও বেতারের অভিনেত্রী ছিলেন। তাঁর পরে আবু হেনা মোস্তফা কামাল। ভাইবোনদের মধ্যে ছোট আবুল হায়াৎ মোহাম্মদ কামাল। বাংলাদেশ বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক ছিলেন এবং গীতিকার হিসেবে তিনিও সুপরিচিত।

পাবনা জেলা স্কুল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পাস করেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল। ১৯৫২ সালে পূর্ববঙ্গ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে ১৩তম স্থান অধিকার করেন তিনি। ১৯৫৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে ৭ম স্থান লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৯ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল। পরে ১৯৬৯ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'দ্য বেঙ্গলি প্রেস অ্যান্ড লিটারারি রাইটিং (১৮১৮-১৮৩১)' শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য পিএইচ.ডি. ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

আবু হেনা মোস্তফা কামালের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৫৯ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে প্রভাষক হিসেবে। তারপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ কলেজে কিছু দিন শিক্ষকতা করেন। ১৯৬০ সালে যোগ দেন রাজশাহী সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগে। দুই বছর সেখানে ছিলেন। ১৯৬২ সালে তিনি প্রাদেশিক সরকারের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক হয়ে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অস্থায়ী প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। একই পদে স্থায়ী নিয়োগ পেয়ে ১৯৬৫ সালে যোগ দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। পিএইচ.ডি. পর্যায়ে গবেষণার জন্য ১৯৬৬ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে যান তিনি। পিএইচডি শেষে ১৯৭০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসার পর তিনি রিডার পদে উন্নতি লাভ করেন। আবু হেনা মোস্তফা কামাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন ১৯৭৩ সালের ৫ অক্টোবর। সেখানে ১৯৭৬ সালে অধ্যাপক হন তিনি। ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক পদে যোগদান করেন। ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক পদে যোগদান করেন।

১৯৫৬ সালের ২৫ অক্টোবর হালিমা খাতুনকে (ডাক নাম টুলু, পরবর্তীতে হালিমা মোস্তফা) নিয়ে দাম্পত্যজীবন শুরু করেন। আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও হালিমা মোস্তফা দম্পতির পাঁচ সন্তান। সন্তানদের মধ্যে কাবেরী মোস্তফা কম্পিউটার প্রোগ্রামার, কাকলী মোস্তফা ইতিহাসবিদ, সুজিত মোস্তফা আধুনিক, সেমি ক্ল্যাসিক্যাল ও নজরুল সঙ্গীতের শিল্পী, শ্যামলী মোস্তফা চিকিৎসক এবং সৌমী মোস্তফা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ও পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ সমাপ্ত করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সহপাঠী ও বন্ধু ছিলেন প্রয়াত শিল্পী ও সুরকার আনোয়ারউদ্দিন খান এবং কবি, সঙ্গীতশিল্পী ও ক্রীড়াবিদ আসাফউদদৌলা। বন্ধু ছিলেন অকালপ্রয়াত সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী আবু বকর খান। এদের অনুপ্রেরণা তাঁকে সঙ্গীতমগ্ন করেছে। পরবর্তীকালে তাঁর অনেক গানে কণ্ঠ ও সুর দিয়েছেন আনোয়ারউদ্দিন খান। এছাড়া শিল্পী ফেরদৌসী রহমানের কণ্ঠেও তাঁর অনেক গান দারুণ সফল হয়ে উঠেছে। আবু হেনার গানের সুরকারদের মধ্যে আছেন আব্দুল আহাদ, কাদের জামেরী, আবেদ হোসেন খান, মশিহ-উল-আলম, আবু বকর খান, মীর কাসেম খান, মনসুর আহমেদ, শেখ মোহিতুল হক, খোন্দকার নূরুল আলম, শেখ সাদী খান, অজিত রায়, রাজা হোসেন খান, প্রনব ঘোষ, দেবু ভট্টাচার্য, অনুপ ভট্টাচার্য, সমর দাস, জালাল আহমেদ, সৈয়দ আনোয়ার মুফতী প্রমুখ। আবু হেনা মোস্তফা কামালের লেখা অনেক গান তখনও যেমন রেডিও, টেলিভিশন ও গ্রামোফোনে শোনা যেত এখনও তেমন শোনা যায়।

বেঁচে থাকতে গানের কোনো সংকলন করেননি আবু হেনা মোস্তফা কামাল। মৃত্যুর পর ১৯৯৫ সালে তাঁর দুই শতাধিক গান নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী প্রকাশ করে 'আমি সাগরের নীল' গ্রন্থ। তাঁর গানের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। দুই হাজারের মতো গান লিখেছেন তিনি। আবু হেনা মোস্তফা কামালের অনেক গানের বিষয় হয়েছে প্রেম। এছাড়া তিনি গান লিখেছেন নিসর্গ, প্রকৃতি, উৎসব, দেশাত্ববোধ ও ভাষা নিয়ে। ভাষা, ছন্দ ও অলঙ্কার বিন্যাসে পরিশীলিত সেসব গান। আবু হেনা মোস্তফা কামালের গান সম্পর্কে প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক ও সমালোচক আনিসুজ্জামানের মূল্যায়ন হচ্ছে- 'আবু হেনার কবিতার মতো গানেও প্রাধান্য পেয়েছে প্রেম। এক মোহমুগ্ধ, স্বপ্নচারী, আবেগময় সত্ত্বা ক্রিয়াশীল ছিল তাঁর অধিকাংশ গীত রচনার ক্ষেত্রে।'

বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা গানে যেসব গানকে আমরা চিরসবুজ বলতে পারি সেসব গানের মধ্যে আবু হেনা মোস্তফা কামালের অনেক গান আছে। যেমন: ১)'অনেক বৃষ্টি ঝরে/ তুমি এলে যেন এক মুঠো রোদ্দুর/ আমার দু'চোখ ভরে॥' ২) 'সেই চম্পা নদীর তীরে/ দেখা হবে আবার যদি/ ফাল্গুন আসে গো ফিরে॥' ৩) 'হাতের কাঁকন ফেলেছি খুলে/ কাজল নেই চোখে/ তবু তোমার কাছে যাবো/ যা বলে বলুক লোকে॥' ৪) 'আমি সাগরের নীল/ নয়নে মেখেছি এই চৈতালি রাতে/ ফুলকঙ্কন পরেছি দখিন হাতে॥' ৫) 'ভ্রমরের পাখনা যতদূরে যাক না ফুলের দেশে/ তুমি তবু গান শুধু শোনাও এসে॥' ৬) 'নদীর মাঝি বলে: এসো নবীন/ মাঠের কবি বলে এসো নবীন/ দেখেছি দূরে ঐ সোনালি দিন॥' ৭) 'ওই যে আকাশ নীল হলো আজ/ সে শুধু তোমার প্রেমে॥' ৮) 'মহুয়ার মোহে গেল দিন যে/ তোমার কাছে আমার কত ঋণ যে/ সে কথা না হয় হলো নাই বলা/ ঝরা পাতার কান্না শুনে আজকে আমার পথ চলা॥' ৯) 'অপমানে তুমি জ্বলে উঠেছিলে সেদিন বর্ণমালা/ সেই থেকে শুরু দিন বদলের পালা॥' ১০) 'তুমি যে আমার কবিতা, আমার বাঁশির রাগিনী' ১১) 'পথে যেতে দেখি আমি যারে' ১২) 'যায় যদি যাক প্রাণ, তবু দেবো না দেবো না দেবো না গোলার ধান' ১৩) 'এই পৃথিবীর পান্থশালায় গাইতে গেলে গান'। ১৪) 'তোমার কাজল কেশ ছড়ালো বলে/ এই রাত এমন মধুর/ তোমার হাসির রঙ লাগল বলে/ দোলে ঐ মনের মুকুর॥'

১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া আবু হেনা মোস্তফা কামালের গান দিয়ে। গানের কথা ছিল, 'ওই যে আকাশ নীল হ'লো, সে শুধু তোমার প্রেমে'। চলচ্চিত্রের জন্যও অনেক গান লিখেছেন আবু হেনা। বাংলাদেশের যেসব চলচ্চিত্রে তাঁর গান ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য 'দর্পচূর্ণ', 'যোগবিয়োগ', 'অনির্বাণ', 'সমর্পণ', 'অসাধারণ' ও 'কলমীলতা'। এর মধ্যে 'অসাধারণ' চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যও তাঁর রচনা। চলচ্চিত্রটির পরিচালক ছিলেন মুস্তফা আনোয়ার।

১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'আপন যৌবন বৈরী' । আবু হেনা মোস্তফা কামালের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'যেহেতু জন্মান্ধ' প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের দশ বছর পর অর্থাৎ ১৯৮৪ সালে। এর চার বছর পর (মৃত্যুর এক বছর আগে) ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর তৃতীয় এবং সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ 'আক্রান্ত গজল'। তিনটি গ্রন্থে মোট কবিতা আছে শতাধিক। এর বাইরে তাঁর আরও অনেক কবিতা অপ্রকাশিত থেকে গেছে। গান দিয়ে যেমন শ্রোতাকে মুগ্ধ করেছিলেন তেমনি কবিতা দিয়েও পাঠকের মন জয় করেছিলেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল। সমালোচকরাও তাঁর কবিতার প্রশংসা করেছেন।

কবিতায় আবু হেনা মোস্তফা কামালের প্রধান অবলম্বন প্রেম ও নারী। কবিতার ছন্দের ক্ষেত্রে আবু হেনা মোস্তফা কামাল গুরুত্ব দিয়েছেন কবিতাটির মেজাজকে। যে কবিতার মেজাজ যে রকম ছন্দও হয়েছে সেরকম। তাঁর কবিতা সম্পর্কে সাহিত্য সমালোচক আনিসুজ্জামানের মূল্যায়ন: 'কবিতায় কখনো তিনি সীমা লঙ্ঘন করেন না। এই সংযম তাঁর স্বভাবজাত নয়, অর্জিত, এবং সংযমের ফলে তাঁর অনেক কবিতা বলা- না বলার আলোছায়ায় ঘিরে থাকে। স্তবক, চরণ, শব্দ সরিয়ে সরিয়ে পাঠককে তার অন্দরমহলে প্রবেশ করতে হয়। প্রায় চল্লিশ বছরের সাধনায় আবু হেনা বিস্তর ফসল ফলাননি বটে, কিন্তু যা ফলিয়েছেন তার অধিকাংশই স্বর্ণশস্য। আরো আশ্চর্য এই যে, নিজেকে নতুন করে নিতে তাঁকে বেশি কালক্ষয় করতে হয়নি, অধিক ভাবতে হয়নি।'

আবু হেনা মোস্তফা কামাল ছিলেন একজন উৎকৃষ্ট মানের প্রাবন্ধিক। কবিতা দিয়ে সাহিত্যে তাঁর যাত্রা শুরু হলেও প্রবন্ধ ও সমালোচনায় ছিলেন সবচেয়ে সফল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে সাহিত্যের মননশীল ধারায় তাঁর বিচরণ। তাঁর মননশীল রচনাগুলোতে বহুবিধ প্রসঙ্গে আলোকপাত করা হয়েছে। গল্প, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, সময়, সমাজ, সমকাল এরকম বিষয়কে কেন্দ্র করে তাঁর মননশীল রচনাগুলো। আবু হেনা মোস্তফা কামালের জীবদ্দশায় প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ দুটি। প্রথমটি সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধের সংকলন শিল্পীর রূপান্তর'। এই গ্রন্থের আটটি প্রবন্ধের মধ্যে চারটিরই বিষয় উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ ও সাহিত্য। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে। অন্যটি সাহিত্য সমালোচনা বিষয়ক প্রবন্ধের সংকলন কথা ও কবিতা । এটির প্রকাশকাল ১৯৮১। এই গ্রন্থের মোট ১১টি প্রবন্ধের মধ্যে তিনটিরই পটভূমি উনিশ শতক। এছাড়া ১৯৭৭ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত তাঁর ইংরেজি অভিসন্দর্ভ 'দ্য বেঙ্গলি প্রেস অ্যান্ড লিটারারি রাইটিং' এর বিষয় উনিশ শতকের গোড়ার দিকের সাময়িকপত্র ও সৃষ্টিশীল সাহিত্য।

সমাজ ও সমকাল নিয়ে আবু হেনা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় অনেক কলাম লিখেছেন। দৈনিক বাংলা পত্রিকায় তিনি কলাম লিখতেন 'অমৎসর' ও 'দ্বিতীয় চিন্তা' নামে। সাপ্তাহিক পত্রিকা 'বিচিত্রা'-য় লিখতেন 'অবান্তর কথকতা' নামে। 'চিত্রালী উপহার' পত্রিকায় লিখতেন 'অতিথির কলাম'। বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত 'ধান শালিকের দেশ' পত্রিকায় 'ইছামতীর সোনালী-রূপালী' শিরোনামে নিজের ছেলেবেলার নানা ঘটনা লিখেছেন। আলবেয়ার ক্যামুর 'ক্যালিগুলা' নাটকটি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন তিনি। আবু হেনা মোস্তফা কামালের বিভিন্ন ধরনের গদ্য নিয়ে তাঁর মৃত্যুর পর ২০০০ সালে কথাসমগ্র নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করে সময় প্রকাশন।

নিজের লেখা সংরক্ষণ করা হয়ে উঠত না আবু হেনার। সংরক্ষণের চেয়ে লিখে যাওয়ার ব্যাপারেই তিনি বরাবর বেশি নিবেদিত ছিলেন। শিল্পীর রূপান্তর 'ও কথা ও কবিতা' এই দুটি প্রবন্ধ গ্রন্থের বাইরে আবু হেনার আরও অনেক প্রবন্ধ অগ্রন্থিত রয়েছে।

বাংলা কবিতা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য আবু হেনা মোস্তফা কামাল বেশকিছু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে 'আপন যৌবন বৈরী' কাব্যের জন্য ফরিদপুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি উন্নয়ন সংস্থার আলাওল পুরস্কার, ১৯৮৬ সালে কবিতার জন্য যশোর সাহিত্য গোষ্ঠীর সুহৃদ সাহিত্যগোষ্ঠী স্বর্ণপদক, ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক, ১৯৮৯ সালে তিনি সচেতনা সাহিত্য পুরস্কার ও আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি। এছাড়াও পেয়েছেন সাদত আলী আকন্দ স্মৃতি পুরস্কার।

বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক থাকাকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ১৯৮৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩ টা ৪৫ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর। ঢাকার আজিমপুর নতুন কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তিনি।

তথ্যসূত্র: বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত আনিসুজ্জামান ও বিশ্বজিৎ ঘোষ সম্পাদিত গ্রন্থ আবু হেনা মোস্তফা কামাল রচনাবলী প্রথম খণ্ড, সময় প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আবু হেনা মোস্তফা কামালের রচনা সংকলন কথাসমগ্র গ্রন্থ, বাংলা একাডেমী প্রকাশিত শামসুজ্জামান খান, সেলিনা হোসেন ও জাকিউল হক সম্পাদিত একুশের স্মারকগ্রন্থ '৯০ থেকে। এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে তথ্য ও অন্যান্য সহযোগিতা দিয়েছেন আবু হেনা মোস্তফা কামালের কন্যা কাবেরী মোস্তফা ও পুত্র সুজিত মোস্তফা।

সংক্ষিপ্ত জীবনী:

জন্ম: পাবনা জেলার পাবনা থানার গোবিন্দা গ্রামে ১৯৩৬ সালের ১৩ মার্চ আবু হেনা মোস্তফা কামালের জন্ম।

বাবা-মা: বাবা এম. শাহজাহান আলী এবং মা খালেসুননেসা।

পড়াশুনা: পাবনা জেলা স্কুল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পাস করেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল। ১৯৫২ সালে পূর্ববঙ্গ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে ১৩তম স্থান অধিকার করেন তিনি। ১৯৫৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে ৭ম স্থান লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৯ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল। পরে ১৯৬৯ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'দ্য বেঙ্গলি প্রেস অ্যান্ড লিটারারি রাইটিং (১৮১৮-১৮৩১)' শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য পিএইডি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

কর্মজীবন: আবু হেনা মোস্তফা কামালের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৫৯ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে প্রভাষক হিসেবে। তারপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ কলেজে কিছু দিন শিক্ষকতা করেন। ১৯৬০ সালে যোগ দেন রাজশাহী সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগে। দুই বছর সেখানে ছিলেন। ১৯৬২ সালে তিনি প্রাদেশিক সরকারের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক হয়ে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অস্থায়ী প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। একই পদে স্থায়ী নিয়োগ পেয়ে ১৯৬৫ সালে যোগ দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণার জন্য ১৯৬৬ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে যান তিনি। পিএইচডি শেষে ১৯৭০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসার পর তিনি রিডার পদে উন্নতি লাভ করেন। আবু হেনা মোস্তফা কামাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন ১৯৭৩ সালের ৫ অক্টোবর। সেখানে ১৯৭৬ সালে অধ্যাপক হন তিনি। ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক পদে যোগদান করেন। ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক পদে যোগদান করেন।

সংসার জীবন: ১৯৫৬ সালের ২৫ অক্টোবর হালিমা খাতুনকে (ডাক নাম টুলু, পরবর্তীতে হালিমা মোস্তফা) নিয়ে দাম্পত্যজীবন শুরু করেন। আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও হালিমা মোস্তফা দম্পতির পাঁচ সন্তান। সন্তানদের মধ্যে কাবেরী মোস্তফা কম্পিউটার প্রোগ্রামার, কাকলী মোস্তফা ইতিহাসবিদ, সুজিত মোস্তফা আধুনিক, সেমি ক্ল্যাসিক্যাল ও নজরুল সঙ্গীতের শিল্পী, শ্যামলী মোস্তফা চিকিৎসক এবং সৌমী মোস্তফা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ও পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ সমাপ্ত করেছেন।

মৃত্যু: বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক থাকাকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ১৯৮৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩ টা ৪৫ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর। ঢাকার আজিমপুর নতুন কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তিনি।

লেখক: ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ

পুনর্লিখন: গুণীজন দল

Share on Facebook
Gunijan

© 2017 All rights of Photographs, Audio & video clips and softwares on this site are reserved by .