হারিয়ে যাওয়া অনেক তথ্য উঠে এসেছে তাজউদ্দীনের ডায়েরিতে
‘তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা একজন মানুষ। সংকটময় মুহূর্তে তিনি শক্ত
হাতে জাতির হাল ধরেছিলেন। এই মানুষটির দিনলিপিতে উঠে এসেছে ইতিহাসের
হারিয়ে যাওয়া অনেক অজানা তথ্য। তাঁর ডায়েরি আমিত্বপ্রধান নয়, ডায়েরিতে
প্রাধান্য পেয়েছে জনগণের বিভিন্ন সমস্যা।’
মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরির (দিনলিপি) চতুর্থ
খণ্ডের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তারা এ কথা বলেন। গতকাল ২৩ জুলাই, ২০১০
শুক্রবার জাতীয়
জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে জাতীয় এই নেতার জন্মদিনে চতুর্থ
খণ্ডের প্রকাশনা অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। ডায়েরির চতুর্থ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে
তাজউদ্দীন আহমদের ১৯৫২ সালের দিনলিপি।
অধ্যাপক খান সারওয়ার মুর্শিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান
অতিথি ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান
উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর
ডায়েরিতে নানা ঘটনার অনুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন। সমসাময়িক কোনো রাজনীতিকের
কাছ থেকে আমরা এ ধরনের বর্ণনা পাই না। তাঁর ডায়েরির হারিয়ে যাওয়া
অংশগুলো উদ্ধার করা গেলে তাজউদ্দীন সম্পর্কে একটি পূর্ণ ধারণা পাওয়া যেত।
সঙ্গে অনেক অজানা তথ্যও পাওয়া যেত।’
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘তাজউদ্দীনের কাছে জাতি হিসেবে আমাদের অনেক
ঋণ। সংকটময় মুহূর্তে তিনি শক্ত হাতে জাতির হাল ধরেছিলেন। কিন্তু যেভাবে
তাঁর জীবনাবসান হয়েছে, তা তাঁর প্রাপ্য ছিল না।’
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তাজউদ্দীনের সঙ্গে তাঁর বিভিন্ন স্মৃতি বর্ণনা
করে বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি হঠাৎ করে ওঠা আজকের ব্যাপার
নয়। তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের চিন্তা
করেছিলেন।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, তাজউদ্দীনের ব্যক্তিগত জীবন এবং
সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি একসঙ্গে উঠে এসেছে তাঁর ডায়েরিতে। সব
বর্ণনা তিনি দিয়েছেন একেবারে নির্বিকার, নিরাসক্ত ভঙ্গিতে।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান, অধ্যাপক
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও কবি বেলাল চৌধুরী বক্তব্য দেন।
বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট: দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের
জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল এক সমাবেশের আয়োজন করে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক
জোট। রমনা পার্কের গেটে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে বক্তারা বলেন, তাজউদ্দীন
আহমদ শোষণমুক্ত, ন্যায়বিচারভিত্তিক ঐক্যবদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।
তিনি গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের সমন্বয়ে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন
দেখতেন।
চিত্রনায়ক ফারুকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত
সাধারণ সম্পাদক অরুণ সরকার, চিত্রপ্রযোজক খোরশেদ আলম, চিত্রপরিচালক জাকির
হোসেন প্রমুখ বক্তব্য দেন।
বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের ৮৫তম জন্মবার্ষিকী
আজ ২৩ জুলাই। রাজনীতিতে মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা ও সততার প্রতীক তাজউদ্দীন
আহমদ ১৯২৫ সালের এই দিনে ঢাকার অদূরে কাপাসিয়া উপজেলার দরদরিয়া গ্রামে
জন্মগ্রহণ করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। ১৯৪৭ সালে
দেশ বিভাগের পর থেকে দেশে যত আন্দোলন হয়েছে, তার সবগুলোতেই সক্রিয়
অংশগ্রহণ ছিল তাঁর। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী
বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করলে সংকটময় পরিস্থিতির তৈরি হয়। ওই অবস্থায় অস্থায়ী
সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি। স্বাধীন দেশে তিনি
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। তবে আদর্শ ও নীতিগত প্রশ্নে ১৯৭৪
সালের ২৬ অক্টোবর তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫
আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার কিছুদিন পর ৩ নভেম্বর তাজউদ্দীন আহমদসহ
কারাগারে বন্দী জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
কর্মসূচি: এ উপলক্ষে আজ বিকেল সাড়ে চারটায় তাজউদ্দীন আহমদ লিখিত ডায়েরির
প্রকাশনা উৎসব জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে।
আজ ২১ জুলাই, ২০১০। প্রতিবছরের মতো এবারও ফিরে এসেছে এই দিন । ১৯৭৬
সালের এই দিনে প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেওয়া
হয়। আর তাই এদিনটিকেই জাতি বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমাণ্ডার কর্নেল
তাহেরের মৃত্যুদিবস হিসেবে স্মরণ করে।
১৯৭১ সালের ২৯ এপ্রিল বিকেলে তাহের পাকিস্তানি সেনাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে
স্বদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন৷ কিছু খাবার আর পানীয় নিয়ে, নানা
ধরনের ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে, সংশয়- সন্দেহকে দূরে ঠেলে অবশেষে তাহের
মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে পৌঁছান৷
জুলাই মাসে তিনি ১১ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব নিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করতে
থাকেন৷ কিন্তু দুর্ভাগ্য যে তিনি যুদ্ধটি শেষ করতে পারলেন না৷ কামালপুর
অপারেশনের মাধ্যমে যুদ্ধের সবচেয়ে সম্ভাবনার দুয়ারটি খুলতে গিয়ে ঐ
অপারেশনে তিনি মর্টার সেলের আঘাতে আহত হন৷ আহত তাহেরকে চিকিত্সার জন্য
ভারতের পুনা, লক্ষ্ণৌ ইত্যাদি জায়গায় ঘুরতে হয়৷ মোটামুটি সুস্থ হয়ে দেশে
ফিরে আসেন ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে৷
১৯৭৫ সালের ২৪ নভেম্বর সামরিক সরকার কর্নেল তাহেরকে বন্দি করে৷ স্পেশাল
ট্রায়ালে কর্নেল তাহেরের ফাঁসির আদেশ হয়৷ ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই ভোরবেলা
কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়৷ কিংবদন্তি বিপ্লবী তাহের কবিতা আবৃত্তি
করতে করতে ফাঁসির মঞ্চে এগিয়ে গেলে সমাপ্তি হয় এক বিপ্লবী জীবনের৷
স্মরণসভায় বক্তারা-হেনা দাসের আদর্শ আত্মস্থ করতে হবে
‘অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ে তোলা বা রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের সংকটে হেনা
দাসকে বারবার স্মরণ করতে হবে। তাঁর আদর্শকে আত্মস্থ করতে হবে। পাশাপাশি
তাঁর মতো সংগ্রামী নারীদের অবদানকে পরিপূরক ইতিহাসেও স্থান দিতে হবে।’
গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাবেক সভানেত্রী হেনা দাসের
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পরিষদ আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা এ কথা বলেন।
মহিলা পরিষদের সুফিয়া কামাল ভবন মিলনায়তনে এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন
মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম।
বক্তারা বলেন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, নানকার আন্দোলন, চা-শ্রমিকদের
অধিকার আদায়, নারীর মানবাধিকার রক্ষার আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনের
পরিচিত মুখ ছিলেন হেনা দাস। তিনি শেষ দিন পর্যন্ত আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত
ছিলেন। স্মরণসভায় সভাপতির বক্তব্যে আয়শা খানম বলেন, ‘কবি সুফিয়া কামাল,
হেনা দাসদের মতো নারীর অবদানকে পরিপূরক ইতিহাসে স্থান দেওয়ার জন্য
সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে।’
কর্মজীবী নারীর সভাপতি শিরিন আখতার বলেন, ‘গণতন্ত্রের আন্দোলনে নারীরা
কীভাবে সংগ্রাম করেছেন হেনা দাস ছিলেন তাঁর মূর্ত প্রতীক।’
মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, ‘হেনা দাস বর্ণাঢ্য
জীবনের অধিকারী ছিলেন। তিনি শুধু পথ চলতে জানতেন। তাঁর সেই ঐতিহ্যকে
ধারণ ও আত্মস্থ করা সবার দায়িত্ব।’ জাতীয় শিক্ষক কর্মচারী ফ্রন্টের প্রধান
সমন্বয়কারী কাজী ফারুক আহমেদ হেনা দাসকে সমাজ বদলের নেতা হিসেবে উল্লেখ
করেন।
পরিবারের পক্ষে হেনা দাসের মেয়ের জামাই বাংলাদেশ প্রকৌশল
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, হেনা দাস যে রায় বাহাদুরের
মেয়ে ছিলেন তা তাঁর ব্যবহার, চালচলনে কখনোই বোঝা সম্ভব হতো না।
অন্যান্যের মধ্যে আলোচনা করেন মহিলা পরিষদের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী দীপ্তি রানী
সিকদার। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন রাখী দাশ পুরকায়স্থ। হেনা দাসকে স্মরণ
করে গান গেয়ে শোনান শিল্পী অনিমা চক্রবর্তী।
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হেনা দাসের মৃত্যুবার্ষিকী
উপলক্ষে গতকাল বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির কার্যালয়েও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়।
এতে সভাপতিত্ব করেন সমিতির সভাপতি কে এম আবুল হাসান।
আজ আজম খানের মুখগহ্বরের ঝিল্লির ক্যানসারের অস্ত্রোপচার করা হবে।
সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে নয়টায়
নাক, কান ও গলার শল্যচিকিৎসক অ্যান্ড্রু লয় হেং চেইনের নেতৃত্বে এই
অস্ত্রোপচার হবে। হাসপাতালে আজম খানের সঙ্গে আছেন এরশাদুল হক। সিঙ্গাপুর
থেকে তিনি জানিয়েছেন, এই অস্ত্রোপচারের জন্য আট-নয় ঘণ্টা লাগবে। এরপর
তাঁকে দুই দিন নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হবে। তারপর কেবিনে
দেওয়া হবে। দুই সপ্তাহের মধ্যে আজম খান সুস্থ হয়ে দেশে ফেরার ব্যাপারে আশা
প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকেরা।
এদিকে মুঠোফোনের মাধ্যমে নিজের সুস্থতার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন আজম
খান।
আজম খানের জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য গতকালই ৫০ হাজার ডলার (সিঙ্গাপুর) জমা
দিতে হয়েছে। আজম খানের চিকিৎসায় সহযোগিতার জন্য গতকাল মঙ্গলবার স্কয়ার
টয়লেট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী ১০ হাজার মার্কিন ডলার
দিয়েছেন।
এগিয়ে এসেছেন শিল্পীরাও। শিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন এক লাখ টাকা, উপস্থাপক
ও নির্মাতা হানিফ সংকেত এক লাখ টাকা, কুমার বিশ্বজিৎ ৫০ হাজার টাকা,
আইয়ুব বাচ্চু ৫০ হাজার টাকা, ফেরদৌস ওয়াহিদ ৩০ হাজার টাকা, এন্ড্রু কিশোর
২৫ হাজার টাকা ও হাবিব ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন। এ ছাড়া ডেসটিনি গ্রুপের
পরিচালক (অর্থ) সাইদুর রহমান চার লাখ টাকা, সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান
আজিজ খান এক লাখ টাকা, আরটিভির পক্ষ থেকে মোর্শেদ আলম এক লাখ টাকা এবং
ক্যাটস আই থেকে দেওয়া হয়েছে ৫০ হাজার টাকা।
গত ২৬ জুন আজম খানের মুখগহ্বরের ঝিল্লির ক্যানসার ধরা পড়ে। এরপর স্থানীয়
চিকিৎসকদের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট
এলিজাবেথ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।